১.
নাদিয়া ইন্টারে ভর্তি হয়ে ক্লাস করতে শুরু করেছে মাত্র ২ মাসের মতো হলো। ফেনী সরকারি কলেজে। ভর্তি হবার কয়েক দিন পরেই ওর বাবা ওকে একটি মোবাইল ফোন কিনে দিলেন। যেহেতু কলেজ ওদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে। পথেঘাটে কোনো অসুবিধা হলে যেন ফোনে জানাতে পারে, সেজন্য। নাদিয়ার বাবা ওদের পাশ^বর্তী বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করেন। ব্যবসা ভালোই। নাদিয়ার বড় ভাই একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বিয়ে করেছেন। একটি সন্তানও রয়েছে। ফ্যামিলি নিয়ে থাকেন কর্মস্থলে। ওর মেঝো ভাই স্কলারশীপ নিয়ে জাপানে পড়ালেখা করছে। ওর বাবা বাড়িতে বিল্ডিং করেছে বছর পাঁচেক আগে। কলেজে ভর্তির এক মাসের মধ্যেই ওর সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো একটি মেয়ের সাথে, যার নাম রিয়া। রিয়ার বাড়ি পাশর্^বর্তী পরশুরাম উপজেলায় আর নাদিয়াদের বাড়ি ছাগলনাইয়া উপজেলায়।
একদিন নাদিয়া কলেজ থেকে ফিরছিলো। বাড়ির কাছেই চলে এলো। ওর ইমু নাম্বারে একটি কল এলো অপরিচিত নাম্বার থেকে। প্রথমবার সে কল রিসিভ করেনি। দ্বিতীয়বার কল আসার পরও সে রিসিভ করেনি। কল শেষ হবার পর সে ইমু আইডিটির প্রোফাইলে গিয়ে দেখলো, আইডিটি একটি ছেলের। অপরিচিত। দেখতে না দেখতেই আবার কল এলো। নাদিয়া মোবাইলের সুইচ অফ করে বাড়ি চলে গেলো।
রাতে পড়তে বসার পর ওর মোবাইলে আবার ঐ নাম্বার থেকে কল এলো। নাদিয়া মোবাইল হাতে নিয়ে বারান্দায় চলে গেলো। ঘরে শুধু ওর মা । ওর বাবা তখনো দোকান থেকে ফিরেননি। বারান্দায় গিয়ে নাদিয়া ফোন রিসিভ করলো। প্রথমে কোনো কথা না বলে শুনে রইলো।
‘হ্যালো। আমি সিজান। কোরিয়া থাকি। বাড়ি...’
‘সিজান নামে কারো সাথে কখনো আমার এর আগে পরিচয় হয়নি। আপনি কে, কোথায় থাকেন, সেগুলো জেনে আমার কী লাভ?’
‘আমি আপনার পূর্ব-পরিচিত, তা বলিনি। তবে আপনাকে আমি চিনি।’
‘আমার এখন পড়ার সময়। প্লীজ, আমাকে বিরক্ত করবেন না। আর কখনো আমাকে ফোন করলে আপনার আইডিটা ব্লক্ড করে দেবো।’
‘রাগ করবেন না। ‘সরি’ বলছি। আপনাকে আমি আর কখনো আপনার পড়ার সময় কল করবো না। তবে অনুরোধ, আমার আইডিটা কখনো ব্লক্ড করবেন না।’
‘ঠিক আছে। এখন রাখুন। আইডিটা ব্লক্ড করবো কিনা, তা পরে দেখা যাবে।’
‘রাখছি’ বলেই সিজান কলটি কেটে দিলো।
কিছুক্ষণ পড়ার পর নাদিয়ার মোবাইলে আরেকটি কল এলো। দেখলো, রিয়ার ফোন। ফোন রিসিভ করেই নাদিয়া বললো, ‘রিয়া, কী হলো, আজ পড়তে বসার পর বার বার শুধু ফোনই আসছে।’
‘এজন্যই তো তোকে কিছুক্ষণ আগেও ফোন করে ‘বিজি’ পেয়েছি। কী, কারো সাথে ফোনে সম্পর্ক হয়েছে নাকি? শোন, ডুবে ডুবে জল খাওয়ার দিন শেষ। এখন নেটওয়ার্কের যুগ। ডুবে ডুবে জল খাওয়া টের পাওয়া এখন খুব সহজ।’
‘কী বলছিস এসব? তোর মতো নাকি? তুই তো সেই ক্লাস নাইন থেকে প্রেম করা শুরু করেছিস। এ পর্যন্ত কয়েকটা প্রেম শেষ।’
‘সবার জীবনে প্রেম আসে।’ দোষ কী? এখন যেমন তোর জীবনে এলো।’
‘আবারও একই কথা। ফোনে কারো সাথে কথা বলা মানেই কী প্রেম? মানুষ তার কোনো আত্মীয়-স্বজনের সাথে কি ফোনে কথা বলে না?’
‘তাই বলে এতোক্ষণ ধরে? বিশ^াসযোগ্য নয়।’
‘আচ্ছা এসব বাদ দে। কেন ফোন করেছিস বল।’
‘এমনিতেই।’
‘তাহলে রাখ। এখনো অনেক পড়া বাকি। কাল দেখা হবে।’
২.
‘কলেজে ঠিকমতো ক্লাস হচ্ছে?’ রাতে খেতে বসার পর নাদিয়ার বাবা ওকে প্রশ্ন করলেন।
‘ক্লাস ঠিকমতোই হচ্ছে। কিন্তু অনেক ছেলেমেয়ে ঠিকমতো ক্লাস করছে না। হাই স্কুলে কেউ এরকম করার সাহসই পেতো না।’
‘হাই স্কুলে আর কলেজে এই তফাৎ অনেক আগ থেকেই। কলেজে উঠলে অনেক ছেলেমেয়ে শিক্ষকদেরকে মানে না। তুই কিন্তু এরকম করিস না। আর ছুটির পর কোথাও দেরি করিস না।’
‘কোনো কারণে পথেঘাটে দেরি হলে অবশ্যই ফোন করে জানিয়ে দিস। আমার কিন্তু খুব চিন্তা হয়।’ নাদিয়ার মা বললেন।
‘ঠিক আছে, মা।’
এসময় নাদিয়ার ফোন বেজে উঠলো। ওর মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে ফোন করেছে?’
নাদিয়া ফোন হাতে নিয়ে দেখলো, ওর ছোট ভাইয়া। বললো, ‘মা, ছোট ভাইয়া।’
‘কথা বল।’
নাদিয়া ফোন রিসিভ করে কথা বলতে বলতে ওর রুমের দিকে চলে গেলো।
৩.
পরদিন সকালে নাদিয়া নাশতা করতে বসে ওর ফোনের ডাটা অন করতেই ইমু থেকে মেসেজের শব্দ বেজে উঠলো। ওর বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ম্যাসেজ এসেছে নাকি!’ নাদিয়া ‘হ্যাঁ, অফিস থেকে সারাদিন নানা মেসেজ আসে’ বলে দ্রুত নাশতা শেষ করেই ওর রুমের দিকে চলে গেলো। গিয়ে দেখলো অপরিচিত ঐ নাম্বার থেকে ইমুতে ওকে একটি মেসেজে একটি শিশির ভেজা গোলাপ ফুলের ছবি পাঠানো হয়েছে। সাথে লিখে দেয়া হয়েছে, ‘শুভ সকাল, নাদিয়া। আপনাকে প্রথম বার কল করেই ভয় পেয়ে গেছি। ব্লক্ড হয়ে যেতে চাই না কোনো কালে। তাই আমার মন চাইলেও আপনাকে বেশি বেশি কল করবো না। মাঝে মাঝে করবো। একবার করে। একসাথে দু’বার কল করলে আপনি হয়তো বিরক্ত হয়ে যেতে পারেন। কখনো যদি মন ভালো থাকে, তাহলে রিসিভ করবেন। না হয় নয়। আমি বুঝে নেবো আপনি কোনো কাজে আছেন। আপনি আমার স্বপ্ন। ইতি, আপনার অপরিচিত, সিজান।’
মেসেজটি দেখার পর নাদিয়া কিছুটা ভেবে ফোন রেখে দিলো। ফোন রেখে কলেজে যাবার জন্য প্রস্তুত হলো।
৪.
রাতে ঘুমাতে গেলো নাদিয়া। শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলো, ‘কে এই ছেলে? কেন আমার সাথে এমন যোগাযোগ? ওর বাড়ি কোথায়? আমাকে কিভাবে চেনে? আমার ইমু নাম্বার পেলো কার কাছ থেকে? আমাকে কি কখনো দেখেছে? আমি তার স্বপ্ন হলাম কী করে? আমি কি দেখতে এতোই সুন্দর? প্রশ্নগুলোর উত্তর পাবো কোথায়, কিভাবে?’ একটু থেমে আবার ভাবলো, ‘প্রশ্নগুলোর উত্তর না জানলেই কি নয়? কেন আমি প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে চাই? ছেলেটির আইডি কি ব্লক্ড করে দেয়া দরকার? ব্লক্ড করে দিয়ে কি লাভ হবে? ছেলেটি হয়তো আরেকটি আইডি থেকে আমাকে ফোন করবে।’ ভাবতে ভাবতে ওর ঘুম এসে গেলো।
৫.
পরদিন সকালে নাদিয়া নাশতা শেষ করে মোবাইলের ডাটা অন করামাত্র আবার শুনতে পেলো মেসেজের শব্দ। দেখলো ছেলেটির মেসেজ। তাতে একটি ফুলের ছবি, সাথে লেখা আছে, ‘শুভ সকাল। রেগে যাবেন, এই ভয়ে আপনাকে কল করছি না। যদি কখনো আমাকে কল করতে মন চায়, করতে পারেন। আমি সেই অপেক্ষায় থাকলাম। আপনার অপরিচিত, সিজান।’
৬.
কলেজ ছুটির পর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নাদিয়া ওর বান্ধবী রিয়াকে বললো, ‘রিয়া, এখানে একটু দাঁড়া। তোর কাছ থেকে একটা কিছু জানার আছে।’
‘কী?’
‘আচ্ছা, তোর প্রেমগুলো ভেঙ্গে গেলো কেন?’
‘ভাগ্য খারাপ। এজন্য।’
‘ভাগ্য খারাপ, ঠিক আছে। তবে কারো না কারো কিছু না কিছু দোষ তো ছিলই।’
‘তোকে বলছি। প্রথমটা ক্লাস নাইনের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়েছিল। ছেলেটি ছিল আমার ক্লাসমেট। আমাদেরকে একটু বেশি কথা বলতে দেখে ছেলেটির বাড়ির পাশের আরেকটি মেয়ে ছিল, সে সন্দেহ করলো এবং ছেলেটির মা’কে বলে দিলো। ছেলেটির মা স্কুলে এসে আমাদের ক্লাস-টিচারকে বিষয়টা বললেন। ক্লাস টিচার আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, এ বয়সে এগুলো খুব খারাপ। এরপর তোমাদের এ বিষয়ে আর কোনো অভিযোগ পেলে তোমার বাবা-মা’কে জানাবো। আমি এ কথা শুনে স্যারের কাছে মাফ চেয়ে বললাম, স্যার, আমার সম্পর্কে আর এমন কোনো কথা কখনো শুনবেন না। প্লীজ, আমার বাবা-মা’কে জানাবেন না। তাঁরা জানলে আমাকে মেরেই ফেলবেন।’
‘বুঝলাম। কথা এতো লম্বা করিস না। সংক্ষেপে বল।’
‘এরপরের সম্পর্কটা দশম শ্রেণিতে উঠার শুরুর দিকে। ছেলেটি আমারই আরেক ক্লাসমেট ছিল। ক্লাসে প্রায় সময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো। ক্লাসের বাইরেও। ছেলেটি পড়ালেখায়ও বেশ ভালো ছিল। একসময় আমিও ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি। ওর সাথে কথা বলতে শুরু করি। শেষে আমাদের ক্লাসের কিছু ছেলেমেয়ে আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে বিষয়টা বলে দিলো। আমি জানতাম না। স্যাররা আমার বাবাকে ফোন করে বিষয়টা বলে দিলেন। আমার বাবা আমার উপর অনেক রাগান্বিত হলেন। বললেন, যদি আর এমন কথা শুনি, তাহলে তোর পড়ালেখাই বন্ধ করে দেবো।’ একটু থেমে রিয়া আবার বলতে শুরু করলো, ‘শেষের ঘটনাটা আমাকে বড় শিক্ষা দিলো। এখন শুনবি? অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাড়িতে মা চিন্তা করবেন।’
‘তুই যেভাবে মিষ্টি মেখে দিয়েছিস, কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করাটা বেশ কষ্টকর হবে।’ এই কথা বলে নাদিয়া হাতের ঘড়িটি দেখে বললো, ‘এতোক্ষণে আমি বাড়ির কাছাকাছি চলে যেতাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি থেকে ফোন আসবে। ভাইয়ারাও ফোন করে বসতে পারে। এখন চল। কাল শুনবো।’
৭.
রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমাতে গিয়ে নাদিয়া ওর মোবাইলের ডাটা অফ করতে যাবে, এমন সময় একটি মেসেজ এলো। নাদিয়া ইমু ওপেন করে দেখলো লেখা আছে, ‘আপনার কল পেলে খুশি হবো। সিজান।’
নাদিয়া তেমন কিছু না ভেবে কল করলো। নাদিয়া কল করার পর চুপ করে রইলো। কিছুক্ষণ পর সিজান বললো, ‘কেমন আছেন?’
‘ভালো।’
‘পড়াশুনা শেষ হয়েছে?’
‘হয়েছে। আমি আপনাকে ফোন করেছি আপনাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার ছিল বলে।’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সিজান বললো, ‘আপনি আমাকে যে কোনো প্রশ্ন করতে পারেন?’
‘আপনি কি আমাকে আগে থেকে চিনতেন?’
‘না। অল্প কয়েক দিন হবে, আপনার সম্পর্কে জানতে পেরেছি।’
‘কিভাবে?’
‘কিছু মনে করবেন না। এই বিষয়টা অন্য একদিন বলা যাবে। আর কী জানতে চান?’
‘আপনার বাড়ি কোথায়? আমাদের এলাকায়?’
‘আপনাদের এলাকায় নয়। আপনাদের উপজেলায়ও নয়। তবে বেশি দূরেও নয়। আপনাদের জেলারই অন্য এক উপজেলায়।’
‘কোন্ উপজেলায়?’ নাদিয়া বেশ কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো।
‘পরশুরাম।’
‘কলেজে আমার এক বান্ধবীও আছে পরশুরামের। খুব কাছের বান্ধবী।’
‘থাকতে পারে। আমাদের পরশুরামের অনেক ছেলেমেয়ে ফেনী কলেজে পড়ে।’
‘আপনি আমার কলেজ সম্পর্কেও জানেন?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো নাদিয়া।
‘জি¦।’
‘আচ্ছা, আপনি কিভাবে আমার সম্পর্কে জানতে পারলেন? আর কেনই বা আমাকে ফোন করছেন, মেসেজ করছেন?’
‘আপনার এই উত্তরটাও দেবো। তবে পরে। কিছু মনে করবেন না। আর আপনাকে কেন ফোন বা মেসেজ করছি, তা সরাসরি বলতে পারবো না। আপনি একটা কিছু ধারণা করে নিন, হয়তো মিলে যাবে। বেশি ভাবতে হবে না।’
এসময় নাদিয়ার মা ওকে ডাকতে ডাকতে ওর রুমে প্রবেশ করলেন। নাদিয়া সিজানকে কিছু না বলেই ফোন কেটে দিলো। ওর মা নিজের মোবাইল হাতে নিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ‘তোর বড় ভাইয়া তোর সাথে কথা বলবে। তোর ফোনে নাকি চেষ্টা করেছে, কল ঢুকেনি। ধর, ওর সাথে কথা বল।’
৮.
পর দিন কলেজ থেকে ফেরার সময় রিকশায় করে ফিরছিল নাদিয়া এবং রিয়া। নাদিয়া বললো, ‘তোর শেষ প্রেমকাহিনী বললি না তো।’
‘প্রেম কাহিনী না বলে বিরহের কাহিনী বলাই ভালো।’
‘আচ্ছা, এক লাইন ভুল হয়েছে। এবার বল।’ হাসতে হাসতে নাদিয়া বললো।
‘কাল তোর কাছে বলতে গিয়ে আমার দেরি হয়ে গেছে। মা আমাকে বকা দিলেন। আমি বললাম, বাজারের মাঝখানে মাঝে মাঝে যানজট লেগে যায়।’
‘কথা লম্বা তো হচ্ছে তোর কারণে। এসব কথা না বলে তাড়াতাড়ি শুরু কর। রিকশায় থাকতে থাকতেই বল। আজ আর তোর দেরি হবে না। রিকশা থেকে নামার পর তুই তো উঠে যাবি পরশুরামের গাড়িতে। তাড়াতাড়ি বল।’
‘এসএসসি’র প্রিটেস্ট পরীক্ষার পর আমাদের গ্রামের একটি ছেলে আমি স্কুলে যাবার সময় আমার পিছু পিছু হাঁটতো। আমি পেছনে তাকালে সে মুচকি মুচকি হাসতো। ছেলেটির বাড়ি ছিল আমাদের পাশের গ্রামে। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়তো আমাদের এই কলেজেই। কয়েক দিন এভাবে হাঁটার পর আমাদের এলাকার কেউ কেউ বিষয়টা জানতে পারে। আমার বাবা-মাও বিষয়টা জানতে পারেন। আমার বাবা একদিন আমাকে বললেন, আমি যেন ছেলেটিকে মোটেই পাত্তা না দিই। আমার বাবা আমাদের এলাকার মেম্বারের মাধ্যমে ছেলেটির বাবাকে বিষয়টা জানালেন। ছেলেটির বাবা বললেন, ইন্টার পাশ করলেই ওকে বিদেশ পাঠিয়ে দেবে। এরপরও ছেলেটি আমার পিছু ছাড়েনি। একদিন ছেলেটি আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বসলো। আমি সেদিন কিছুই না বলে স্কুলে চলে গেলাম। ধীরে ধীরে আমিও ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি। ওর সাথে গোপনে মোবাইলে কথা বলতে শুরু করি। ছেলেটি এরপর আমার পিছু নেয়া বন্ধ করে দিলো। আমাদের এ সম্পর্ক কেউ জানতে পারলো না। সবাই ভাবলো আমাদের মধ্যে এখন আর কোনো সম্পর্ক নেই। কয়েক মাস এভাবে চলার পর একদিন ছেলেটি ফোনে আমাকে বললো, ওর বাবা-মা নাকি দশ-পনেরো দিনের জন্য ঢাকা গেছেন। ওর মায়ের একটা অপারেশন করতে হবে। ঢাকায় ওর খালাম্মার বাসায় গিয়ে থাকবেন। সামনে ওর ফাইনাল পরীক্ষা। তাই ওকে বাড়িতে রেখে গেলেন। খাওয়া-দাওয়া করছে ওর চাচার ঘরে। ছেলেটি এসব কথা বলার পর আমাকে বললো, সন্ধ্যায় কোনো অযুহাত দেখিয়ে ওদের ঘরে যাবার জন্য। আমি বললাম, কেন? ও বললো, কেন আবার? ঘরে কেউ নেই। এই সুযোগে আমরা একটু মজা করবো। ওর মুখে এটা শুনার পর আমি কিছুই না বলে ফোন কেটে দিলাম। আমি গভীর চিন্তায় পড়ে গেলাম। শেষে ছেলেটির সাথে সব রকম যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম।’
‘কী জঘণ্য কথা!’
রিকশা থেমে গেলো।
‘আরো কিছু কথা আছে। আগামীকাল।’ বলেই রিয়া নেমে গেলো আগে। পরে নামলো নাদিয়া।
৯.
রাতে খেতে বসার পর হঠাৎ রিয়ার কিছু কথা মনে পড়ে গেলো নাদিয়ার। রিয়া বলেছিল, ‘সন্ধ্যায় কোনো অযুহাত দেখিয়ে ওদের ঘরে যাবার জন্য। আমি বললাম, কেন? ও বললো, কেন আবার? আমরা এই সুযোগে একটু মজা করবো।’
এরপর ভাবলো, ‘আমিও কি এমন কোনো বিপদে পড়তে যাচ্ছি?’
ভাবছিলো আর খাচ্ছিলো। এক পর্যায়ে ও পানির শূন্য গ্লাস মুখের কাছে নিলো পানি খাওয়ার জন্য। ওর মা এটা লক্ষ্য করে বললেন, ‘কিছু ভাবছিস মনে হয়। খাওয়ার সময় মানুষ এতো আনমনা হয় নাকি! কী ভাবছিস এতো!’
রিয়া কিছু বললো না।
ওর বাবা বললেন, ‘কলেজে কোনো সমস্যা হয়েছে? কোনো ছেলে তোকে ডিস্টার্ব করছে? আমাকে বল। আমি কলেজে গিয়ে শিক্ষকদেরকে বলবো। ওরাই ব্যবস্থা করবে।’
‘না, বাবা। তেমন কিছুই না। আমার এক বান্ধবীর একটা দুঃখের কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেলো।’
‘তোর বান্ধবীর বিষয় নিয়ে তোর এতো মাথা ঘামানোর কী দরকার! খেতে বসেছিস। মনোযোগ দিয়ে খা। পরে চিন্তা করিস।’
খাওয়া শেষে নাদিয়া ঘুমাতে চলে গেলো। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ডাটা অফ করে শুয়ে পড়লো।
১০.
সকালে ঘুম থেকে উঠে ডাটা অন করতেই নাদিয়া মেসেজের শব্দ শুনতে পেলো। দেখলো সিজানের মেসেজ- ‘শুভ সকাল। রাতে ভেবেছি ফোন করবেন। কিন্তু করেননি। কষ্ট পেলাম। সিজান।’ নাদিয়া মেসেজটি দেখে সামান্য ভেবে মোবাইল রেখে দিয়ে কলেজে যাবার জন্য প্রস্তুত হলো।
১১.
সেদিন কলেজ থেকে ফেরার সময় রিকশায় বসে নাদিয়া রিয়াকে বললো, ‘রিয়া, এখন আর কোনো ছেলের সাথে তোর সম্পর্ক নেই?’
‘সে কথাই আজ তোকে বলার ইচ্ছা ছিল। এই ঘটনার পর সিদ্ধান্ত নিলাম, জীবনে আর প্রেম করবো না। বিয়ে তো হবেই। যার সাথেই হয়, হোক। তবে প্রেম যদি করি, তা করবো ইন্টার পাশের পর এবং এমন কারো সাথে, যে আত্মনির্ভরশীল, ভদ্র এবং স্মার্ট। ক্লাসমেট বা পড়াশুনা করে, এমন কোনো ছেলের সাথে আর প্রেম নয়।’
‘দারুণ ডিসিশন!’ একটু থেমে নাদিয়া আবার বললো, ‘তোকে একটা কথা বলবো। আজ নয়। এমনিতেই আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে।’
১২.
রাতে নাদিয়া পড়তে বসেছে মাত্র। শুনতে পেলো মোবাইলে মেসেজের শব্দ। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো এই মেসেজ, ‘হয়তো পড়তে বসেছেন। পড়া শেষ হলে একটা মেসেজ দেবেন। আমি ফোন করবো। না হয় কল করবেন। সিজান।’
নাদিয়া পড়ালেখা শেষ করে খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমাতে গেলো। ভাবলো, ‘কেন আমি মেসেজ বা কল করতে যাবো? আমি তো ওকে চিনিই না। অপরিচিত মানুষের সাথে সম্পর্ক করে রিয়ার মতো কোন্ বিপদে পড়ি, কে জানে!’
আবার ভাবলো, ‘রিয়ার মতো বিপদে পড়বো কিভাবে? ছেলেটি তো দেশেই থাকে না। আমাকে বিপদে ফেলবে কিভাবে! ঠিক আছে, দেখি ছেলেটি কী বলতে চায়?’ এটা ভাবার পর সে একটি মেসেজ লিখে সেন্ড করলো সিজানের ইমুতে। মেসেজটি হলো, ‘আমার পড়ালেখা এবং খাওয়া-দাওয়া শেষ। নাদিয়া।’
মেসেজটি সেন্ডের পর পরই কল এলো।
রিয়া বললো, ‘কিজন্য ফোন করেছেন?’
‘তা বললে আপনি হয়তো আমার সাথে আর কখনো কথাই বলবেন না।’
‘আচ্ছা, বলুন তো, আপনাকে আমি আগে থেকে চিনি না, জানি না, কখনো আপনাকে দেখিওনি, তবু আপনার সাথে কথা বলা কি আমার ঠিক?’
‘অচেনা-অজানা অনেক মানুষের সাথে মানুষের অনেক সময় পরিচয় হয়ে যায় না?’
‘কিভাবে?’
‘আমার মা কখনো আমার বাবাকে চিনতেন না। বিয়ের আগে আমার মা আমার বাবাকে কখনো দেখেনই নি। আমার বাবা আমার মাকে দেখতে যাওয়ার পর আমার মা নাকি নিচের দিকে মুখ করেই বসে রইলেন। আমার বাবার দিকে একটি বারের জন্যও তাকাননি। তবু এখন তাঁরা কত সুন্দরভাবে, কত পরিচিত মানুষের মতো জীবন যাপন করছেন! একে অন্যের কতো আপনজন!’
‘দারুণ যুক্তি।’
‘আরো বুঝার দরকার আছে। এখন তো বিয়ের সময় বাস্তবে দেখার আগেই অনেক ছেলেমেয়ে একে অন্যকে দেখে নেয়।’
‘বিয়ের কথা আনলেন কেন আবার এখানে?’
‘উদাহরণ হিসেবে বললাম।’
‘আর কোনো উদাহরণ পাননি?’
‘এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত মনে হয়েছে।’
‘ঠিক আছে। কিছু মনে করবেন না। এখন ঘুমাবো।’
‘তাহলে, রাখুন।’
কথা শেষ করে নাদিয় ঘুমাতে গেলো। ওর কানে বাজতে থাকে একটি আধুনিক গানের দু’টি লাইন: ‘হৃদয়ের ভাষা, বোঝা বড় দায়, ভুল করে অনেকে প্রেমে পড়ে যায় তবু, ভালোবাসা ভালোলাগা এক নয়...’। (১)
১৩.
পরের দিন নাদিয়া কলেজ ছুটির পর কলেজের গেট দিয়ে বের হবার সময় দেখতে পেলো একটি ছেলে দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওকে দেখছে। ছেলেটিকে ওদের ক্লাসের কোনো ছেলেই মনে হলো। নাদিয়া রিয়াকে বললো, ‘দেখতো, ঐ ছেলেটি তাকিয়ে তাকিয়ে কি আমাদেরকেই দেখছে?’
‘সেরকমই তো মনে হচ্ছে। তবে তোকে নাকি আমাকে দেখছে, বুঝা যাচ্ছে না। ছেলেটি অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। আমি ওকে চিনি। পরশুরামেই ওদের বাড়ি। মাঝে মাঝে গাড়িতে ওর সাথে দেখা হয়ে যায়। ভাবিস না, হয়তো এমনি এমনিই দেখছে আমাদেরকে।’
‘বাদ দে। প্রায়ই এরকম দেখি। ছেলেদের এটা অভ্যেস। মেয়েদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। লজ্জা-শরম নেই। আচ্ছা, তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল।’
‘কী কথা?’
‘একটি ছেলে আমাকে ডিস্টার্ব করছে।’
‘তোদের এলাকার কোনো ছেলে নাকি?’
‘আরে, ডিস্টার্ব করছে ফোনে, বাস্তবে না।’
‘তাই? বলবি তো! কিভাবে ডিস্টার্ব করছে? ইমুতে, নাকি ভয়েস কলে?’
‘ইমুতে।’
‘ইমুতে কিভাবে ডিস্টার্ব করে? তুই এতোদিনে ওকে ব্লক্ড করে দিসনি কেন? নিশ্চয়ই ওকেও তোর ভালো লেগেছে।’
‘কী বলিস এসব! ভালো লাগলে কি এটাকে ‘ডিস্টার্ব’ বলতাম?’
‘ডিস্টার্ব মনে হচ্ছে, আবার ওকে ব্লক্ডও করে দিচ্ছিস না, নিশ্চয়ই কোনো কিন্তু আছে!’
‘তোর কাছে ‘এক’ বললে তুই ‘দুই’ বানিয়ে ফেলিস। বড় সেয়ানা মেয়ে। আচ্ছা এ প্রসঙ্গ বাদ দে। তোর কথা বল। তোরা কয় ভাই-বোন?’
‘আমরা দুই ভাই, দুই বোন।’
এসময় নাদিয়ার মোবাইলে কল এলো। সে কল রিসিভ করার পর বললো, ‘মা কলেজ একটু আগেই ছুটি হলো। আমার এক বান্ধবীর সাথে কথা ছিল। এই জন্য দেরি হয়ে গেছে। এইতো আসছি।’
১৪.
রাতে পড়াশেষে নাদিয়া ভাবলো, ‘সিজানকে একটা মেসেজ করলে কেমন হয়? আজই সিদ্ধান্ত নেবো ওকে কি ব্লক্ড করবো, নাকি করবো না? থাক ওকে কল-ই করি।’ এটা ভেবে নাদিয়া সিজানকে কল করলো। সিজান ফোন রিসিভ করে বললো, ‘অনেক খুশি হলাম আপনার কল পেয়ে। যেন আকাশের একটি তারা আমার হাতে ঝরে পড়েছে। কেমন আছেন?’
‘ভালো। আপনি কেমন?’
‘আমিও ভালো।’
কিছুক্ষণ উভয়ে নীরব থাকার পর সিজান বললো, ‘কিছু বলছেন না যে?’
‘আমি কেন বলবো? আমার কল পেয়ে নাকি আপনি খুশি হলেন, আপনার হাতে আকাশের তারা ঝরে পড়লো! আপনিই বলুন।’
‘কল করেছেন আপনি। আমি আগ বাড়িয়ে কথা বলা কি ঠিক হবে?’
‘বেশ যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারেন আপনি। আচ্ছা, আমিই বলছি। আপনি যে আমার সাথে কথা বলছেন, আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা কতটুকু, আমাকে কি জানারো যাবে?’
‘যাবে না কেন? তবে তার আগে কথা আছে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, বাংলাদেশের যারা কর্মসূত্রে বিদেশে যায়, তাদের অনেকেরই শিক্ষাগত যোগ্য তেমন থাকে না। আমারও তেমন নেই। আপনি শুনলে আপনার মন খারাপ হয়ে যেতে পারে অথবা বিশ^াস করতে কষ্ট হবে।’
‘কথা ঘোরাচ্ছেন কেন? এটাও কি পরে বলবেন?’ মুচকি হেসে নাদিয়া জিজ্ঞেস করলো।
‘না, এখনি বলছি। আমি ইন্টার পাশ। আপনার বিশ^াস না হলে বলুন, আমি আপনাকে আমার সর্টিফিকেটগুলোর ছবি পাঠিয়ে দেবো ইমুতে।’
‘কিভাবে? সেগুলো তো দেশে!’
‘আগে আমার ছোট ভাইকে বলে সেগুলোর ছবি নেবো। এরপর আপনাকে রিসেন্ড করবো।’
‘বুঝলাম। আর মাত্র একটি প্রশ্ন।’
‘না, তার আগে বলুন, প্রথম উত্তরটি কি আপনার বিশ^াস হয়েছে?’
‘হয়েছে। কারণ এখন অনেক ডিগ্রীপাশ ছেলেও বিদেশে চলে যায় দেশে ভালো চাকরি পায় না বলে। আমার এক খালোতো ভাইও গেছে দুবাইতে। ডিগ্রী পাশ।’
‘এবার বলুন আপনার শেষ প্রশ্ন।’
‘আমরা যে মাঝে মাঝে কথা বলি, এটার নাম কী? প্রেম, নাকি অন্য কিছু?’
‘এটা প্রেম নয়।’
‘তাহলে?’
‘আমার মনে হয় এটা বিয়ের আগে একটা মেয়ে এবং একটা ছেলের মধ্যে পারস্পরিক বুঝাপড়া।’
‘তাহলে প্রেম কী?’
‘তা আমি বলতে পারবো না। কারণ এ পর্যন্ত কারো সাথে প্রেম-টেম কিছু করিনি। আর প্রচলিত প্রেম সম্পর্কে আমার বিশ^াস, মানুষের জীবনে প্রেম খুব জরুরী বিষয় নয়।’
‘এবার তাহলে বলুন, আমার সম্পর্কে আপনার কতটুকু জানা হলো?’
‘শেষ প্রশ্ন তো এর আগেই করা হয়ে গেলো। আর প্রশ্ন করা যাবে না!’ একটু থেমে সিজান আবার বললো, ‘আচ্ছা, এই প্রশ্নটির উত্তর হিসেবে শুধু এটা বলে রাখি, আপনার সম্পর্কে আমার তেমন কিছুই আর জানার বাকি নেই। আপনার সব বিষয়ে আমি খুশি।’
‘তাই নাকি!’
এভাবে অনেকক্ষণ ধরে ওদের কথা চললো। নাদিয়া খুব বেশ খুশি মনে কথা বললো।
১৫.
পরদিন কলেজে ছুটির পর কলেজ গেট পার হয়ে নাদিয়া এবং রিয়া রিকশা স্টেশনের দিকে আসতে লাগলো। নাদিয়া বললো, ‘তোর সাথে একটা কথা ছিলো।’
‘ঐ ছেলেটির সম্পর্কে, যে গতকাল আমাদেরকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিল?’
‘না।’
‘তবে?’
‘আচ্ছা,ঠিক আছে, আগে এই ছেলেটির কথা বলে নিই। তোর জন্য যখন আমি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম, তখন ছেলেটি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমাকে দেখছিলো। আমি যখন ওর দিকে তাকালাম, তখন ও আমার পাশ দিয়ে সামনের দিকে চলে গেলো।’
‘তাহলে তোর পেছনে লেগেছে ছেলেটি? কোনো ব্যাপারই নয়। কলেজে এটা স্বাভাবিক। ডিস্টার্ব না করলেই হয়। তুই আর কোন কথা বলবি, তাড়াতাড়ি বল। সময় কম।’
‘যে ছেলেটি ইমুতে আমার সাথে কথা বলছিল, ওর কথাবার্তা আমার ভালো লাগতে শুরু করেছে। কী করবো? ওকে ব্লক্ড করতে মন চাইছে না। সম্পর্ক ধরে রাখবো? কোনো সমস্যা হবে?’
‘আমি কি বলবো? ছেলেটিকে নানাভাবে প্রশ্ন কর। বুঝতে চেষ্টা কর। তোর ভালো তুই-ই বুঝিস।’
‘তুই তাহলে কিছু বলবি না?’
‘তোর এখন বুঝজ্ঞান হয়েছে। ইন্টারে পড়–য়া একটা মেয়ে নিজের ভালোমন্দ অনেকটাই বুঝতে পারে।’
ওরা স্টেশনে পৌঁছে গেলো। দু’জনে একটি রিকশায় চড়ে বসলো।
১৬.
রাতে কিচেনে মায়ের কাছে গিয়ে নাদিয়া ওর মাকে বললো, ‘মা, তোমাকে একটা প্রশ্ন করার ছিলো।’
‘এখন তোর পড়ার সময়। গিয়ে পড়তে বস। আরেক সময় জিজ্ঞেস করিস।’
‘কাল শুক্রবার। সকালে পড়তে পারবো।’
‘ঠিক আছে। কী বলবি বল।’
‘মা, আমাদের ক্লাসের অনেক বান্ধবীকে দেখি বিভিন্ন ছেলের সাথে সম্পর্ক করছে। এসব কি ঠিক?’
‘হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?’
‘মা, যদি কখনো আমার এমন কোনো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়? এজন্য আগেভাগেই সতর্ক হচ্ছি।’
ওর মা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, ‘কথা লম্বা। ভালো করে শুন। এসব সম্পর্ক ঠিক নয়। আমদের ফ্যামিলিতেও দুর্ভাগ্যবশত এমন ঘটনা ঘটেছিলো। তোর বয়স যখন চার-পাঁচ বছর, তখন আমার ছোট বোন, মানে তোর ছোট আন্টির সাথে একটা ছেলের এরকম সম্পর্ক হয়। আমার বাবা ওকে অনেক বুঝালেন। তবু তার মত পাল্টায়নি। তোর বাবাও এই সম্পর্কের বিরোধী ছিল। শেষে তোর আন্টি পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করলো। পরে দেখা গেলো ছেলেদের অবস্থা তেমন ভালো নয়। তোর আন্টি অনেক কষ্ট মেনে নিয়ে সংসার করলেন। শেষে ওর ছেলেরা বড় হয়ে বিদেশ গেলো। এখন ওরা মোটামুটি ভালো আছে। তুই এর আগেও আমাকে কয়েকদিন জিজ্ঞেস করেছিলি, তোর বাবা তোর ছোট আন্টির বাড়িতে কম যায় কেন বা তোর ছোট আন্টি এ বাড়িতে কম আসে কেন? আমি একেক সময় তোকে একেক কারণ বলেছি। আজ বললাম আসল কারণ।’
‘এতোদিন বললে কী হতো?’
‘হয়তো তুই তোর আন্টিকে খারাপ ভাবতি। এখন তো বুঝতে পারছিস, এরকম অনেকেই করে।’ একটু থেমে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আর তোর জেঠাতো বোন শিউলীর কথা তো তুই জানিস। সে যখন পালিয়ে যায়, তখন তোর বাবা তোর জেঠাকে বলেছিল, ওকে কোথাও খুঁজতে যেও না। যখন তোমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলেই গেছে, তখন ওর সাথে আর তোমাদের সম্পর্ক রাখার কী দরকার! কিন্তু দেখলি তো, শেষে ওর সংসার ভেঙ্গে গেছে। অভাবে। আর যে ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে, সে নেশাখোরও ছিল।’
‘এখন তো ভালোই আছে সে।’
‘বিয়েটা ভেঙ্গে ওর কপাল খুলে গেছে। এখন ভালো স্বামী পেয়েছে।’
‘আচ্ছা মা, সম্পর্কের বিয়ে করে কি কেউ সুখী হয় না?’
‘হয় না, এমন নয়। তবে এসব বিয়েতে বেশির ভাগ সময় বাবা-মা’রা রাজি থাকেন না। সবাই চান তাদের মেয়ের বিয়ে হবে তাদের পছন্দের পাত্রের সাথে। সামাজিকভাবে।’
‘কিন্তু মা, সম্পর্কের বিয়ে কি সামাজিকভাবে হতে পারে না?’
এসময় দরজায় শব্দ হলো।
‘যা, দরজা খুলে দে। তোর বাবা এসেছেন মনে হয়।’
নাদিয়া আর কিছু না বলে দরজা খুলতে চলে গেলো।
১৭.
পরদিন নাদিয়া কলেজ থেকে ফিরছিলো রিয়ার সাথে। কলেজ গেট পার হয়ে কিছুদূর আসার পর যে ছেলেটি এর আগে কয়েকদিন নাদিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতো, সে এসে নাদিয়ার সামনে ওর মুখোমুখি দাঁড়ালো। নাদিয়া এবং রিয়াও দাঁড়িয়ে গেলো। ছেলেটি বললো, ‘নাদিয়া, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’
নাদিয়া কিছুক্ষণ ভেবে বললো, ‘ভালো কথা। এখন যেতে দাও।’ এটা বলে নাদিয়া এবং রিয়া পাশ কাটিয়ে চলে এলো।
১৮.
রাতে নাদিয়া খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমাতে যাবে, এমন সময় ওর ইমুতে মেসেজ এলো, ‘কল করতে পারি? সিজান।’
নাদিয়া ‘পারেন’ লিখে পাঠাতেই কল এলো।
রিসিভ করে নাদিয়া বললো, ‘কেমন আছেন?’
‘ভালো। আপনি?’
‘আছি। তবে একটু সমস্যা আছে।’
‘বলা যাবে?’
‘শুধু শেয়ার করা যাবে। এতটুকুই। বলে কিছু লাভ হবে না। কারণ আপনি আছেন কোরিয়া।’
‘তবু বলুন।’
‘কলেজে একটি ছেলে আমাকে প্রপোজ করে বসেছে।’
‘আপনার বাবা-মাকে বলেননি?’
‘এখনো বলিনি। ভাবছি তাঁরা অন্য কিছু মনে করে বসেন নাকি!’
‘উল্টপাল্টা ভাববেন না।’
‘তবু আরো দু’একদিন দেখি। কী হয়!’
‘না হয় ছেলেটিকে বলে দিন...।’
‘থেমে গেলেন কেন? কী বলে দেবো?’
‘যা বলতে গেলাম, তা এখন আপনাকে বলা হয়তো ভুল হবে, তাই থেমে গেলাম।’
‘বুঝেছি।’
‘কী?’
‘বলে দেবো, আমিও তোমাকে ভালোবাসি।’
‘বেশ দুষ্টোমীও পারেন দেখছি!’
‘তাহলে কী বলবো, আপনি বলে দিন।’
‘বলবো না।’
এভাবে অনেকক্ষণ চললো ওদের কথা।
১৯.
পরের দিন কলেজ ছুটির পর নাদিয়া কলেজ গেট পার হয়ে রিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। রিয়াকে কল করতে যাবে, এমন সময় রিয়া এসে উপস্থিত হলো। নাদিয়া বললো, ‘দেরি হলো কেন?’
‘ভালো খবর আছে।’
‘কী এমন ভালো খবর?’
‘দেখলি না, আজ ঔ ছেলেটি তোকে ডিস্টার্ব করেনি?’
‘ভেবেছি আজ ওকে শক্ত কোনো কথা বলে দেবো।’
‘তোকে আর বলতে হবে না। আমিই ওকে বলে দিয়েছি। এজন্য আজ তোর পিছু নেয়নি।’
‘কী বলে দিয়েছিস আবার?’
‘বলেছি, নাদিয়া আমার বন্ধু, তুই জানিস। কিন্তু এটা জানিস না, নাদিয়ার আরো আগেই এঙ্গেজমেন্ট হয়ে আছে। ইন্টার পরীক্ষার পরই ওর বিয়ে হবে। ওর পেছনে না হেঁটে সময় থাকতে অন্য কারো পিছে হাঁট, লাভ হবে।’
‘ওহ, থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ্। আমি ভাবতেও পারিনি তোকে দিয়ে আমার এতো বড় উপকার হবে!’
‘ধন্যবাদ দিবি না। তোর জন্য কিছু করতে না পারলে কেন তোর বন্ধু হলাম?’
‘তুই তো দেখি বানিয়ে বানিয়েও কিছু বলতে পারিস।’
‘বিপদে পড়লে কৌশল অবলম্বন করতে হয়। আর বানিয়ে বললাম কই? তোর সাথে একটা ছেলের সম্পর্ক চলছে না? তুই-ই তো বললি।’
‘সম্পর্ক আছে, মানছি। কিন্তু এঙ্গেজমেন্টও কি হয়ে গেছে?’
‘হয়নি। কিন্তু হবার সম্ভাবনা তো প্রবল।’
‘বাদ দে এসব কথা। রিয়া, এক বছরের মতো তোর সাথে বন্ধুত্ব হলো, তুই এখনো আমাদের বাড়ি গেলি না। এটা কেমন কথা!’
‘যাবো। যাবো। তুই আগে আমাদের বাড়ি ঘুরে আয়। তোকে তো আমি মাঝে মাঝে বলি। কিন্তু তুই নানা অযুহাত দেখাস।’
‘না, তুই আগে আসবি। এরপর আমি যাবো। এখন বল, কবে আসবি? সামনের শুক্রবারে আয়।’
একটু ভেবে রিয়া বললো, ‘যাবো, তবে তোর পরিবারকে আজকের এই ঘটনা বলতে পারবি না। আমার সম্পর্কে শুধু বলবি, আমি তোর ক্লাসমেট।’
২০.
রিয়া এলো নাদিয়াদের বাড়ি। খাবার টেবিলে খাবার পরিবেশন করতে করতে নাদিয়ার মা বললেন, ‘তোমার কথা আমার মেয়ে প্রায়ই বলে। আমি কয়েকদিন-ই ওকে বলেছি তোমাকে একদিন আমাদের বাড়ি নিয়ে আসতে।’
নাদিয়ার বাবা বললেন, ‘মেয়েরা মেয়েরা বন্ধুত্ব করলেই বেশি মানায়। সুযোগ পেলেই আমাদের বাড়ি চলে এসো। মনে করবে তোমার কোনো এক আত্মীয়ের বাড়ি।’
‘শুধু আমি এলেই কি হবে? নাদিয়াকেও যেতে হবে আমাদের বাড়ি।’
‘সময় করে যাবে। অসুবিধা নেই।’ নাদিয়ার মা বললেন।
চলে যাবার আগে রিয়া এবং নাদিয়া রিয়াদের ঘরের সামনে সেলফি তুললো অনেকগুলো।
২১.
একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে রিয়া নাদিয়াকে বললো, ‘তোদের বাড়ি গেলাম এক মাস হয়ে গেলো। তুই ‘যাচ্ছি যাবো’ বলে বলে এখনো আমাদের বাড়ি যাসনি। কবে যাবি বল। আগামীকাল আয়। শুক্রবার আছে। কলেজ বন্ধ।’
‘ঠিক আছে, যাবো।’
‘সিএনজি অটোরিকশা একটা রিজার্ভ করে চলে আসিস। তুই আমাকে ফোন করে মোবাইল ড্রাইভারকে দিস, আমি ড্রাইভারকে বলে দেবো আমাদের বাড়ির লোকেশন।’
২২.
রিয়া’দের বাড়ি এলো নাদিয়া।
রিয়ার মা অনেক রকমের খাবার তৈরি করলেন। খাওয়া-দাওয়া শেষে সবাই সোফায় বসলো। রিয়ার বাবা বললেন, ‘তোমার কথা রিয়া প্রায়ই আমাদেরকে বলে। ইদানিং বেশি বলে তোমার বাবা-মায়ের কথা। তোমাদের বাড়িতে যাবার পর তোমার বাবা-মা নাকি ওকে বেশ সমাদর করেছেন। একদিন তাঁদেরকেও সঙ্গে করে আমাদের বাড়ি নিয়ে এসো।’
‘বাবা সময় পান না। মাকে বলে দেখবো।’ নাদিয়া বললো।
‘তোমার মা যেভাবে রিয়াকে সমাদর করেছে, যতকিছু রান্না করে খাইয়েছে, আমরা তোমার জন্য সেরকম কিছুই করতে পারলাম না।’ রিয়ার মা বললেন।
‘কী বলেন এসব! আপনারা যা করলেন, আমরা তার ধারেকাছেও যেতে পারিনি।’
এসময় রিয়ার মায়ের মোবাইলে কল এলো। তিনি কল দেখে বললেন, ‘আমার বড় ছেলে। রাতে আবার ফোন করবে। তখন কথা বলবো। এখন থাক।’
‘শুধু বলে দাও, ঘরে মেহমান। রাতে কথা বলবো।’ রিয়ার বাবা রিয়ার মা’কে বললেন।
রিয়ার মা ফোন রিসিভ করে রিয়ার বাবার শেখানো কথাটি বলেই ফোন রেখে দিলেন।
কিছুক্ষণ পর রিয়ার ছোট ভাই কোত্থেকে এলো। রিয়ার বাবা বললেন, ‘এ হচ্ছে আমার ছোট ছেলে। তিতুমির কলেজে অনার্স করছে। আর ওর বড় ভাই বিদেশ থাকে। মাঝখানে একবার দেশে এসেছে। আর আমাদের বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামীর সাথে সুইডেন থাকে।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘তোমরা কয় ভাই-বোন?’
‘আমরা তিন ভাই-বোন। বড় ভাইয়া সরকারী হাই স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। ছোট ভাইয়া স্কলারশিপ নিয়ে জাপান গেছেন। আর আমি সবার ছোট।’
কথা শেষে রিয়া এবং নাদিয়া ওদের বাড়ির বিভিন্ন লোকেশনে সেলফি তুললো।
রিয়া বললো, ‘তুই আর কখন আমাদের বাড়ি আসিস, ঠিক আছে? সেকেন্ড ইয়ারে পড়ালেখার চাপ বেশি। ছবি তুলে রাখি। তুই আর কখনো আসতে না পারলেও তোর ছবিগুলো স্মৃতি হয়ে থাকবে।’
‘আমার কাছেও তোদের বাড়ির ছবি মধুর স্মৃতি হিসেবে থাকবে। তোর বাবা-মাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। জানি না, আর কখনও আসার সুযোগ হয় কিনা!’
২৩.
রাতে রিয়ার মায়ের ফোনে আবার কল এলো। রিসিভ করার পর রিয়ার বড় ভাই জিজ্ঞেস করলো, ‘মা, কেমন আছো?’
‘ভালো। তোর কী অবস্থা?’
‘ভালো। দুপুরে বলেছিলে ঘরে মেহমান। কোন্ মেহমান? রিয়াকে দেখতে এসেছে নাকি কেউ? ঠিকমতো মেহমানদারি করতে পেরেছো? আমাকে আগে জানাওনি কেন?’
‘রিয়াকে দেখতে আসেনি। এসেছে রিয়ার এক বান্ধবী। এজন্য তোকে আগে বলিনি। আর তোর বাবা বাজার করেছে গতকাল। মেহমানদারিতে কোনো...।’
‘রিয়ার বান্ধবী এসেছিল বলেই আমাকে জানাওনি।’
‘ঠিক তাই।’
‘কোন বান্ধবী?’
‘হ্যাঁ, মেয়েটিকে আমার বেশ ভালো লেগেছে। কিন্তু..।’
‘মা, একটু পরে আবার ফোন করবো। এখন রাখি।’
‘তোর সাথে কথা...।’
২৪.
রাতে পড়ার টেবিলে থাকা অবস্থায় নাদিয়ার ফোন বেজে উঠলো। নাদিয়া রিসিভ না করে মেসেজে লিখে দিলো, ‘এখনো পড়া শেষ হয়নি। খাওয়া-দাওয়াও হয়নি। ফ্রী হলে ফোন করবো।’
‘ঠিক আছে।’ লিখে সিজান রিপ্লাই করলো।
‘আচ্ছা, এবার বলুন, কেন অসময়ে ফোন করেছিলেন সেসময়?’
‘অসময়ের কথা তখন মাথায় আসেনি। আগে বলুন আপনি কি আজ কোথাও গিয়েছিলেন?’
‘গিয়েছিলাম। কেন আপনাকে বলে যাওয়ার দরকার ছিল?’ নাদিয়া কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো।
‘আরে সে কথা নয়। কোথায় গিয়েছিলেন, আমার একটু জানার দরকার।’
‘রিয়া নামে আমার এক বান্ধবী আছে, ওদের বাড়ি গিয়েছিলাম। আপনাদের পরশুরামেই। জীবনে প্রথমবারের মতো পরশুরামও যাওয়া হলো। ঐদিকে আমাদের কোনো আত্মীয়ও...।’
‘হয়তো আরো অনেকবার যাওয়া হতে পারে।’
‘কী বলছেন আপনি!’
‘কেন বলেছি, একটি ছবি পাঠালেই উত্তরটা পেয়ে যাবেন।’
‘বুঝলাম না।’
নাদিয়া ‘বুঝলাম না।’ কথাটি বলতে না বলতেই ওর ইমুতে একটি ছবি এলো সিজানের কাছ থেকে।
নাদিয়া ছবিটি দেখে যেন আকাশ থেকে পড়লো। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলো। ছবিটি দেখে হতভম্ব হয়ে বসে গেলো। আবার দেখলো ছবিটি। দেখলো ছবিটিতে রিয়া’দের ঘরের সামনেই সিজান, রিয়া, রিয়ার মা এবং রিয়ার ছোট ভাই দাঁড়িয়ে আছে।
সিজানের কল এলো আবার। নাদিয়া ফোন রিসিভ করেই বললো, ‘কী করে এমনটা হলো? কে করেছে এই নাটক? আমকে সত্য কথা বলুন।’
‘এটা কোনো নাটক নয়। কোনো পরিকল্পিত ঘটনাও নয়। তবে ঘটনাক্রমে ঘটে গেছে পুরো ব্যাপারটা। তবে এই ঘটনার এক অংশের পেছনে আছি আমি, আরেক অংশের পেছনে আছে রিয়া। কিন্তু এভাবে যে বিষয়টা একটি নাটকের মতো হয়ে যাবে, আমরা কেউ ভাবিনি।’
‘আমার এখনো বিশ^াস হচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে, এটা আপনাদের দু’জনের একটা পরিকল্পিত কারসাজি।’
‘তাহলে আমি আপনাকে আমার মায়ের সাথে একটু আগের কল রেকর্ডটি সেন্ড করি। আপনি বুঝতে পারবেন এর পেছনে আমাদের কারো পরিকল্পনা ছিল না।’
সিজান ওর মায়ের সাথে ওর সর্বশেষ কথোপকথনের রেকর্ড পাঠানোর পর নাদিয়া তা ভালো করে শুনলো।
শেষে সিজানের কাছে আবার কল করলো। বললো, ‘তাহলে বলুন, এই নাটকটা কিভাবে তৈরি হলো?’
‘আমি তো বলেছিই, এটা কোনো নাটক নয়। এটাই বাস্তব। মানুষের জীবনে এমন নাটকীয় ঘটনা প্রায়ই ঘটে। এবার শুনুন কেমন করে এটা হলো।’ একটু থেমে সিজান আবার বলতে শুরু করলো, ‘রিয়াকে কলেজে ভর্তি করাতে নিয়ে গেছি আমিই। আমি তখন তিন মাসের ছুটিতে দেশে ছিলাম। রিয়া মাসখানেক কলেজে যাবার পর একদিন আমার মায়ের কাছে বললো, ‘মা, আমাদের সাথে একটি মেয়ে ভর্তি হয়েছে, সুপার। আমার সাথে মোটামুটি ভাবও হয়ে গেছে। ভাইয়ার সাথে বেশ মানাবে। নাম নাদিয়া। কী বলবো, মেয়েটির স্মার্টনেস যেমন, আচার-ব্যবহারও তেমন।
আমার মা বললেন, তাহলে কাল গিয়ে ওর কাছ থেকে কৌশলে জেনে নিবি, ওর বাবা-মা কি ওকে এখন বিয়ে দেবে?
আমি বাইরে থেকে ঘরে ঢোকার সময় আমার মা এবং রিয়ার এই আলোচনা শুনলাম।
পরের দিন রিয়া কলেজ থেকে এসে মা’কে বললো, মা, কৌশলে মেয়েটির খবর নিয়েছি। ওর বাবা-মা ইন্টার পাশের আগে ওকে বিয়ে দেবে না।
আমার মা বললেন, তাহলে তো ভালোই হলো। তোর ভাইয়া এবার এসে ঘর-দুয়ার করেছে। ওর কাছে এখন টাকা-পয়সাও তেমন নেই। এর পরের বার এলেই নাদিয়ার বাবা-মা’র কাছে আমরা ওর বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠাবো। ভাগ্য ভালো হলে নাদিয়া হয়তো আমাদের ঘরের বউ হবে।
রিয়া বললো, ভাইয়া আবার আসতে আসতে তিন বছর লেগে যাবে। তার আগে যদি নাদিয়ার বিয়ে হয়ে যায়?
মা বললেন, ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়েছি তো এই জন্যই।
আমি এই কথাগুলোও শুনেছি একটু আড়ালে থেকে। হাতে সময় বেশি ছিল না। পরের দিনই আমি কলেজে চলে গেলাম আপনাকে দেখতে। একটি চা দোকানের ভেতরে থেকে দেখলাম রিয়ার সাথে আপনি হেঁটে যাচ্ছেন। আমার খুব বেশি পছন্দ হয়ে গেলো আপনাকে। মনে হলো এর আগে কখনো এমন মেয়ে দেখিনি। সেদিন সন্ধ্যায় রিয়া ওয়াশরুমে যাবার পর ওর মোবাইল ঘেঁটে আপনার নাম্বার খুঁজে বের করি। এরপর কোরিয়া গিয়ে আপনার সাথে যোগাযোগ শুরু করি।
আপনার সাথে আমার এই যোগাযোগের কথা আমাদের ঘরের কেউ জানে না। আপনি রিয়াকে কৌশলে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।’ সিজান লম্বা সময় কথা বলে থামলো।
‘পুরো ব্যাপাটা হজম করতে আমার বেশ কয়েক দিন লেগে যাবে। কী অবিশ^াস্য নাটক ঘটে গেলো আমাদের জীবনে!’ নাদিয়া বললো।
‘আমি ভাবছি এরপর কোন নাটক ঘটে, সেটা নিয়ে।’
‘কোন নাটক নিয়ে চিন্তুা করছেন?’
‘আমাদের এই সম্পর্কের পরিণতি কী হবে, বুঝতে পারছি না। মনে হয় আনন্দের বা বেদনার কোনো না কোনো নাটক ঘটবে। আচ্ছা, আপাততঃ ঘুমান।’
বিরতি
২৫.
সিজানের মোবাইলে অনেকক্ষণ পর ওর মায়ের কল ঢুকলো। ওর মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘অনেকক্ষণ ধরে তোকে কল করছিলাম। কিন্তু তোকে পাচ্ছিলাম না।’
‘মা, আমার এক বন্ধুর সাথে কথা বলছিলাম। আচ্ছা বলুন, রিয়ার যে বান্ধবীটি এসেছিলো আমাদের বাড়ি, সে দেখতে কেমন?’
‘সে দেখতে খুব ভালো। অনেক ভদ্রও। রিয়া কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে আমার কাছে মেয়েটির কথা বলেছিলো। বলেছিলো তোর সাথে ওর বিয়ের কথাও। কিন্তু যখন জানতে পেরেছে ইন্টার পাশের আগে ওর বাবা-মা ওকে বিয়ে দেবে না, তখন আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম। আবার এটাও চিন্তা করতে লাগলাম, যদি তুই আবার দেশে আসার আগেই ওর বিয়ে হয়ে যায়! কিন্তু কিছুদিন আগ থেকে রিয়া বলছে মেয়েটির সাথে নাকি একটা ছেলের সম্পর্ক আছে। তাই আমি তোর সাথে ওর বিয়ের চিন্তা বাদ দিলাম।’
‘বুঝলাম। এই বিষয়ে রিয়া তোমাকে কিছু কথা বলবে আমার পক্ষ হয়ে। এখন ঘুমাও। পরে কথা বলবো।’
২৬.
পরদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে নাদিয়া রিয়াকে বললো, ‘তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দেয়ার আছে। আগে বলো তোমাদের পরশুরামে সিজান নামে কোনো ছেলেকে তুমি কি চেনো?’
‘আমার ভাইয়া ছাড়া আর কোনো সিজানকে আমি চিনি না। আর ‘সিজান’ নামটাও বেশ আন-কমন। সারপ্রাইজের সাথে এই প্রশ্নের কী সম্পর্ক?’
‘সারপ্রাইজটি সত্যিকার সারপ্রাইজ হবার জন্য তোর কাছ থেকে কমপক্ষে এইটুকু জেনে নেয়ার দরকার ছিল।’ এই কথা বলে নাদিয়া থেমে গেলো।
‘কথা বন্ধ করে দিলি কেন? সারপ্রাইজ দিবি কখন?’
‘এখন না, রাতে। ফোনে। এখনও দেয়া যায়। তবে দেবো না। এটা আরেকটা সারপ্রাইজ।’
‘যা, তোর সারপ্রাইজ নিয়ে তুই থাক। আমি চললাম।’
২৭.
রাতে রিয়ার মোবাইলে একটি মেসেজ এলো ইমুতে, পাঠালো নাদিয়া। রিয়া মেসেজটি ওপেন করে দেখলো একটি ছবি, যে ছবিতে রিয়া, রিয়ার মা এবং রিয়ার ছোট ভাইয়া ওদের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অবাক হয়ে রিয়া নাদিয়াকে ফোন করলো। জিজ্ঞেস করলো, ‘এই ছবি তুই কোত্থেকে পেলি? তোর সাথে তো আমি এমন কোনো ছবি তুলিনি? আমার ইমুতেও এমন কোনো ছবি নেই!’
‘কেন তোর ‘সিজান’ ভাইয়া আমাকে দিয়েছে।’
‘সিজান ভাইয়া?’ কিছুক্ষণ থমকে থেকে রিয়া আবার বললো, ‘সিজান ভাইয়ার সাথেই তোর সম্পর্ক? কিভাবে সম্ভব!’
নাদিয়া ফোনে সংক্ষেপে সিজানের সাথে ওর সম্পর্কের কাহিনীটি বললো।
‘আমার জীবনে আমি আর কখনো এমন নাটকীয় কাহিনী শুনিনি।’
২৮.
পরদিন কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে কথা বলছিল রিয়া এবং নাদিয়া। রিয়া বললো, ‘সত্যি, এরচেয়ে বড় কোনো সারপ্রাইজ আমি জীবনে পাইনি। আমার ভাইয়া যে এতো সেয়ানা, ডুবে ডুবে জল খেতে পারে, কখনোই বুঝতে পারিনি। সে এতোই চালাক হয়েছে, আমার মোবাইল থেকে নাম্বার নিয়ে আমার বান্ধবীর সাথে রীতিমতো প্রেম করছে! রাতে ওকে ফোন করেছি। জিজ্ঞেস করেছি, তুই এতো সেয়ানা হলি কখন? সে বললো, তুই যে নাদিয়াদের বাড়ি গেছিস, আমাকে বলিস নি কেন? আমি বললাম, আমি জানতাম নাদিয়ার সাথে একটি ছেলের সম্পর্ক আছে। তাই তোকে আর জানাতে যাইনি। কিন্তু এখন তো দেখছি তুই-ই ওর সাথে ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিস! এ কথা বলার পর ভাইয়া লজ্জা পেয়ে কল কেটে দিলো।’
‘তোর দোষ কম কোথায়! তুই-ই সব গন্ডগোলের মূল। তুই কেন আমার কথা তোদের বাড়ি নিয়ে উঠালি?’
‘কোনো ভুল তো করিনি। কী বলিস?’
‘এসব কথা বাদ দে। সামনে টেস্ট পরীক্ষা। সেই চিন্তা কর।’
‘আমি তো চিন্তা করছি তোকে কোন দিন আমাদের ঘরে ভাবি হিসেবে দেখতে পাবো।’ রিয়া হাসতে হাসতে বললো।
কথাটি শুনে নাদিয়া লজ্জা পেয়ে গেলো।
২৯.
সেদিন রাতে নাদিয়া ওয়াশরুমে যাবে, এমন সময় শুনতে পেলো ওর বাবা ওর মা’কে বলছিলেন, ‘নাদিয়ার বিয়ে নিয়ে বেশ বিপদে আছি।’
নাদিয়ার মা বললেন, ‘বিয়ে না দিতেই বিপদ?’
‘প্রায় প্রতিদিন একটা না একটা পক্ষ ওর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসছে। যত বলি ওর ইন্টার পরীক্ষার আগে ওকে বিয়ে দেবো না, মানুষ যেন তত বেশি প্রস্তাব নিয়ে আসে। ইদানিং একটা ছেলেপক্ষ বেশ জ¦ালাচ্ছে।’
‘বাড়িতেও প্রায়ই অনেকে আসে। আমিও বলে দিই, আগে ওর ইন্টার পরীক্ষাটা হয়ে যাক। আচ্ছা, ছেলেটি কী করছে?’
‘সেনাবাহিনীতে চাকরি করে। সরকারি চাকরি। বেশ বড় চাকরি না করলেও ওদের বংশ বেশ ভালো। ভুঁইয়া বংশ। গ্রামের বাড়ি ছাগলনাইয়া বাজারের একটু পশ্চিমে। কিন্তু ওরা থাকে ফেনী শহরে। ওদের সেখানে নিজস্ব বাড়ি আছে। ছেলের বাবা সোনালী ব্যাংকে চাকরি করতেন। এখন অবসরে।’
‘ছেলের বাবার চাকরি দিয়ে আমরা কী করবো? আর ভুঁইয়া, চৌধুরী, কাজি এসব বংশ এখন মানুষকে ভাত খাওয়ায় না। চাকরিটা ভালো কিনা বলো।’
‘চাকরিটাও ভালো।’
‘আচ্ছা, এর চেয়ে বিদেশী ছেলে ভালো হতো না? দেশে চাকরি করে সংসার চালানো এখন বেশ কঠিন।’
‘বিদেশী ছেলের নামও নিও না। বিদেশে যারা যায়, তাদের বেশির ভাগ-ই অশিক্ষিত।’
‘তবু ভেবে দেখুন। সময় খারাপ। এখনকার মেয়েরা স্বামীদের অল্প আয়ে খুশি হয় না।’
‘না, যা বলেছি, তা-ই। দেশে চোকরি করা ছেলের কাছেই ওকে বিয়ে দেবো। নাদিয়ার বড় মামার সাথেও এই ছেলেটির ব্যাপারে কথা বলেছি। তিনিও রাজি হয়েছেন। ছেলেটিকে দেখলে নাদিয়ারও পছন্দ হবে।’
‘ঠিক আছে। যা ভালো মনে হয়।’
৩০.
বাব-মা কথা শুনে েিনজর রুমে ফিরেই নাদিয়া সিজানকে ফোন করলো। সিজান বললো, ‘কী খবর? কেমন আছেন?’
‘খারাপ খবর আছে। ভয় লাগছে।’
‘আমাকেও ভয় লাগিয়ে দিলেন। তাড়াতাড়ি বলুন।’
‘ভয় হচ্ছে আমাদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে।’
‘কেন, কী সমস্যা?’
‘আমার বিয়ের জন্য অনেক প্রস্তাব আসছে। বাবা-মাকে গতরাত আলাপ করতে শুনলাম, বিদেশি ছেলে নাকি ওদের পছন্দ নয়।’
‘বেশ বিপদের কথা। আমি তো আপনার ইন্টার পরীক্ষা শেষ হবার অপেক্ষায় ছিলাম। ভাবলাম, তখন আমার বাবা-মাকে পাঠাবো বিয়ের প্রস্তার নিয়ে। ওরা তো আপনার ব্যাপারে আগে থেকেই রাজি। এখন তো দেখি ফরম্যালওয়েতে কিছু হবে না। ঠিক আছে, ভেবেচিন্তে কাল আপনাকে জানাবো।’
৩১.
‘মা, তোমাকে কিছু কথা বলার ছিল।’
‘কোন বিষয়ে?’
‘মা, গত রাতে শুনলাম, বাবা তোমাকে বলছে, বিদেশি ছেলে নাকি পাত্র হিসেবে তাঁর পছন্দ নয়?’
‘কেন, তোর সাথে এরকম কোনো ছেলের সম্পর্ক আছে নাকি?’
‘আমি কি এরকম কিছু বললাম? বেশি না বুঝে যা জিজ্ঞেস করছি, তার উত্তর দাও।’
‘হ্যাঁ, বলেছেন। আমারও একই কথা।’
‘মা, আমার অনেক ক্লাসমেটের বিয়ে হচ্ছে বিদেশি ছেলের সাথে। কী অনুবিধা? ওদেরকে তো ভালোই চালাচ্ছে।’
‘আমিও তোর বাবাকে বললাম। কিন্তু তোর বাবা কোনোভাবেই বিদেশী ছেলের সাথে তোর বিয়ে দিতে রাজি হচ্ছে না। তোর বাবা এটাই চিন্তা করছেন, বিদেশে যারা যায়, তাদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত বা কম শিক্ষিত।’
‘কিন্তু মা, আমার বান্ধবীদের অনেকেই বিদেশি বর নিয়ে সুখী। মাঝে মাঝে বিদেশ গিয়েও ঘুরে আসতে পারে!’
‘কেন এতো কথা বলিস! এরকম কোনো ছেলের সাথে যদি তোর কোনো সম্পর্ক থাকে, বাদ দে, লাভ হবে না।’
নাদিয়া চুপ হয়ে গেলো।
৩২.
‘আমি মায়ের সাথে গতরাতে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করেছি। দেখলাম তাঁরা বিদেশি ছেলে পছন্দই করছেন না। কী করবো আমরা?’ নাদিয়া ফোনে সিজানকে বললো।
‘আমিও ভাবছি।’
‘দেখা যাক, আগে আমার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হোক।’
৩৩.
‘নাদিয়া, তোকে আগামীকাল একটা ছেলে পক্ষ দেখতে আসবে। তুই রেডি থাকিস।’
‘কী বলো, বাবা। পরীক্ষা শেষ হলো মাত্র একদিন হলো। দু’একদিন রেস্ট নেবো। দু’একটা জায়গায় ঘুরে আসবো। এরপর এগুলো করা যাবে।’
‘যা বলেছি, তা। কাল ওরা আসবে। এরপর বেড়াতে যেতে পারবি।’
নাদিয়া চুপ থাকলো।
৩৪.
নাদিয়াকে রিং পরালো ছেলেপক্ষ। পরালো ছেলেটিই, যার সাথে ওর বিয়ের কথা হচ্ছে। নাদিয়া কিছুই বললো না। রিং পরনোর পরই ছেলের বাবা বললেন, ‘আপনাদের সবকিছু আমাদের পছন্দ হয়েছে। আর আমাদের সম্পর্কে কী জানলেন, বলুন।’
‘আপনাদের সম্পর্কে যা জানলাম, তাতে আপনাদের সাথে আমাদের আত্মীয়তা করতে কোনো অসুবিধা দেখছি না।’
‘তাহলে বাকি কথাবার্তা আমাদের বাড়িতেই হবে। এখন তাহলে আসি?’
‘আপনাদের বাড়িতে তো সেদিন গেলামই। আর যাওয়ার দরকার নেই। কথা এখানেই বলতে পারেন।’
‘বিয়ের তারিখ কবে দিলে আপনাদের সুবিধা?’.... আলোচনা এভাবে চলতে লাগলো।
৩৫.
‘কী করা উচিত, আমি বুঝতে পারছি না।’ নাদিয়া সিজানকে ফোনে বললো।
‘মোটেই ভাববেন না। আমি যা করবো, আপনি কি একমত হবেন?’
‘এখন আর ‘আপনি আপনি’ ভালো লাগছে না। ‘তুমি’ করে বলবেন।’
‘আর আমকে তো এখনো ‘আপনি’ই বলা হচ্ছে।’
‘আমি এরকমই বলবো। কোনো অসুবিধা থাকলে বলুন।’
‘না, অসবিধার কিছুই দেখছি না। আচ্ছা বলোনি তো, আমি যা করবো, তার সাথে কি একমত হবে?’
নাদিয়া ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়ালো।
৩৬.
নাদিয়ার বাবাকে ওর মা ফোন করে বললেন, ‘নাদিয়া সেই সকালে বাড়ি থেকে গেছে, এখনো ফিরেনি।’
‘কোথায় গেছে?’
‘বলেছে ফেনী যাবে কিছু কেনাকাটা করতে।’
‘ফোন করোনি?’
‘ফোন করেছি। কিন্তু ওর ফোনে কল ঢুকছে না।’
‘আচ্ছা রাখো। আমি ফোন করে দেখি।’
নাদিয়ার বাবা ফোন করে দেখলেন, তাঁর কলও ঢুকছে না। বন্ধ বলা হচ্ছে।
তিনি এবার তাঁর স্ত্রীকে ফোন করে বললেন, ‘এখন কী করা যায়?’
‘আচ্ছা, আরেকটু অপেক্ষা করে দেখি। হয়তো কোনো কারণে দেরি হচ্ছে। এসে পড়বে।’
‘ও বাড়ি ফিরলে আমাকে জানাবে।’
৩৭.
কিছুক্ষণ পর বেজে উঠলো নাদিয়ার মায়ের ফোন। তিনি রিসিভ করতেই নাদিয়া বললো, ‘মা, আমি অনেক আগ থেকেই একটি ছেলেকে পছন্দ করতাম। সে বিদেশ থাকতো। এখন দেশে। আমি বুঝেছি তোমরা আমাদের এই সম্পর্ক মেনে নেবে না। তাই আমি তার কাছেই চলে এসেছি।’
‘কী বলছিস এসব! কেন এমন করতে গেলি? তোকে ওরা সেদিন রিং পরিয়ে গেছে। সেটার কী হবে! এক্ষুণি বাড়ি ফিরে আয়। নয়তো তোর বাবা তোকে জ্যান্ত মেরে ফেলবে।’ বলে নাদিয়ার মা কেঁদে ফেললেন। কেঁদে কেঁদে আবার বললেন, ‘তোর ভাইয়ারাও তোর সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখবে না। বাড়ি চলে আয়। তুই না এলে আমি মরেই যাবো।’
‘মা, কেঁদো না। আমি বাজে কোনো ছেলেকে পছন্দ করিনি। সময় হলেই বুঝবে। বাবাকে বুঝিয়ে বলবে। ঠিক আছে রাখি।’
‘মা, তুই বাড়ি ফিরে...’ নাদিয়ার মা কথা শেষ না করতেই নাদিয়া লাইন কেটে দিলো।
নাদিয়ার মা এরপর নাদিয়ার বাবাকে ফোন করলেন। ফোন করে কান্নাজড়িত কন্ঠে বললেন নাদিয়ার এসব কথা।
নাদিয়ার বাবা সব শুনে বললেন, ‘এখন রাখো, খারাপ লাগছে। কাউকে আপাততঃ কিছু বলো না। কেউ ওর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বলবে, নাদিয়া ওর ভাইয়ার কাছে বেড়াতে গেছে। আমি দেখছি কী করা যায়। আমি বাড়ি আসছি।’
নাদিয়ার মা কান্না করতে লাগলেন।
৩৮.
বাািড়তে এসেই নাদিয়ার বাবা ওর মায়ের ফোন নাম্বার থেকে নাদিয়া যে নাম্বার থেকে কল করেছে, নাম্বাটি বের করে সেখানে কল করে দেখলেন নাম্বারটি বন্ধ বলা হচ্ছে। শেষে বললেন, ‘নাম্বারটি বন্ধ। মেয়েটি এমন কাজ করে বসবে, কখনো ভাবতেও পারিনি। তোমার সাথে কখনো এ বিষয়ে আলাপ করেনি?’
‘আমাকে কখনো সরাসরি কিছু বলেনি। মাঝে মাঝে এটা-সেটা জিজ্ঞেস করতো। একদিন বললো, মা, বিদেশি ছেলেকে বিয়ে করা কি খারাপ? আমি ওকে বুঝিয়ে বললাম। কিন্তু...’
‘আচ্ছা বাদ দাও। মেয়েটির নামও আর কখনো আমার সামনে উচ্চারণ করবে না। আমার সাথে ওর আর কোনো সম্পর্ক নেই। তোমার ছেলেদেরকে বিষয়টা বলে দিও। বলে দিও ওর সাথে যেন কোনো যোগাযোগ না রাখে।’
‘ছেলেপক্ষকে এখন কী বলবেন?’
‘দেখা যাক কী করা যায়!’
নাদিয়ার মা কাঁদতে শুরু করলেন।
৩৯.
এক সন্ধ্যায় নাদিয়ার মায়ের কাছে একটি কল এলো। তিনি কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বলা হলো, ‘আন্টি, আমি রিয়া। নাদিয়ার বান্ধবী। নাদিয়া নাকি পালিয়ে গেছে?’
‘হ্যাঁ, তুমি কিভাবে জানো?’
‘আমি জেনেছি ফেসবুকের মাধ্যমে। ওর ফোনে কল ঢুকছিলো না, তাই ফেসুবকের ম্যাসেঞ্জারে ওর সাথে যোগাযোগ করার পর ও বললো।’
‘আমি এসব কিছু বুঝি না। কিন্তু ও এখন কোথায়, কিছু বলতে পারবে?’
‘আমিও ঠিক জানি না। তবে ছেলেদের বাড়ির খোঁজ নিয়েছি ওর কাছ থেকে। আচ্ছা, আপনাদের অবস্থা বলুন।’
‘নাদিয়ার বাবা ওর উপর খুব ফায়ার। বলে দিয়েছেন, নাদিয়ার সাথে যেন ফ্যামিলির কেউ আর কখনো কোনো যোগাযোগ না করে এবং নাদিয়া যেন এ বাড়িতে আর পা না দেয়।’
‘আন্টি, নাদিয়া আমাকে বলেছে, সে কোনো বাজে ছেলের সাথে পালিয়ে যায়নি। আপনারা রাজি হবেন না দেখে সে পালিয়ে গেছে। নয়তো সামাজিকভাবেই ছেলেটির সাথে বিয়ে হোক, এটা সে..।
‘আচ্ছা, যে ছেলের সাথে পালিয়েছে, ছেলেটির বাড়ি কোথায়, আগে সেটা বলো।’
‘আমি অবশ্য সে কথা বলতেই ফোন করেছি। ছেলেটির বাড়ি হলো পরশুরাম ................। আপনারা গিয়ে ছেলেদের বাড়ি একবার দেখে আসতে পারেন। আপনাদের ধারণাই পাল্টে যাবে। নাদিয়ার কথা থেকে আমি যা বুঝেছি, নাদিয়া বেশ ভালো পরিবারেই গিয়েছে।’
‘নাদিয়া এখন কোথায়? ছেলেদের বাড়ি?’
‘এখন কোথায় বলতে পারবো না। ওরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছে।’
৪১.
নাদিয়ার মা নাদিয়ার মামাকে ফোন করলেন। বললেন, ‘নাদিয়ার কথা তো সবাই জানিস। নাদিয়া যে ছেলেটির সাথে পালিয়ে গেছে, একটু আগে ওর এক বান্ধবী ফোন করে ছেলেটির বাড়ির ঠিকানা বললো। তোর দুলাভাইকে বিষয়টা এখনো বলিনি। তাঁকে বললে তিনি আমার উপর রেগে যাবেন। তুই একটু গিয়ে ছেলেদের বাড়ি দেখে আয়। আর ছেলের বাবা-মাকে বল, আমাদের নাদিয়াকে ফিরিয়ে দিতে। যদি এমনিতে না ফিরিয়ে দেয়, তাহলে তোর বাবাকে জানাবো। তিনি পুলিশ পাঠিয়ে নাদিয়াকে ফিরিয়ে আনবেন।’
‘রিয়াদকেও সাথে নিয়ে গেলে ভালো হতো না?’
‘আচ্ছা, আমি রিয়াদকে ফোন করে দেখি সে বাড়ি আসতে পারবে কিনা!’
‘আমিও ফোন করে বলবো।’
৪২.
নাদিয়ার মামা এবং বড় ভাই রিয়াদ ঠিকানা অনুযায়ী ছেলেদের এলাকায় গেলেন। গিয়ে একটি চা দোকানে বসলেন। দোকানদারকে চা দিতে বললেন। পাশে উপবিস্ট একজন লোককে নাদিয়ার মামা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের এলাকায় ‘বাসার মাষ্টার বাড়ি’ কোনটা?’
‘কেন? তিনি কি আপনাদের কোনো আত্মীয়?’
‘না, আত্মীয় নন। আচ্ছা আপনাকে খুলেই বলি। বাসার মাষ্টার বাড়ির একটা ছেলের সাথে আমার ভাগ্নী পালিয়ে গেছে। ছেলেটির নাম সিজান। আমি মেয়েটির মামা আর এ হচ্ছে ওর বড় ভাই। দশ দিনের মতো হয়ে গেলো। কোনো খোঁজ নেই। থানায় গিয়েছি। পুলিশ ওর মোবাইল নাম্বার নিয়ে দেখেশুনে বলেছে, ওর সিম মোবাইল থেকে খোলা। সিম মোবাইলে লাগানো থাকলে ট্র্যাক করে ওদের লোকেশন খুঁজে বের করা যেতো। ঝামেলার ভয়ে আমরা মামলাও করিনি। অন্য কাউকে জানাতেও পারছি না। শেষে কাল আমার ভাগ্নির এক ক্লাসমেট ফোন করে ছেলের বাড়ির ঠিকানা দিলো।’
‘কেন এসেছেন এখন?’
‘এসেছি নাদিয়াকে ফিরিয়ে নিতে। ওর মা খুব কান্নাকাটি করছে। যা হবার হয়ে গেছে। আমরা ছেলের দোষ দিচ্ছি না। আমাদের মেয়েরই দোষ।’ নাদিয়ার মামা বললেন।
‘ওদের তো বিয়ে হয়ে গেছে।’
‘বিয়ে হয়ে গেছে?’ নাদিয়ার মামা এবং ভাইয়া যেন আকাশ থেকে পড়লেন।
‘হ্যাঁ, নাদিয়া যেদিন পালিয়ে এসেছিলো, সেদিনই কাজি অফিসে গিয়ে ওরা বিয়ে করে ফেলে। ভালোই তো হলো।’
‘ওরা এখন কোথায়?’ নাদিয়ার ভাইয়া জিজ্ঞেস করলো।
‘কোথায় আবার! হানিমুনে। রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার এসব জায়গায় ঘুরছে। মাঝখানে একদিন এসে ওর বাবা-মা’র সাথে দেখা করে আবার চলে গেছে। বাড়িতে আর আসে নি। ঢাকায় সিজানদের আত্মীয় আছে। ওখানেও যেতে পারে।’
দোকানের আরেকজন এবার বললো, ‘আপনার বোন তো বেশ চালাক দেখছি। নয়তো ছাগলনাইয়ার মেয়ে হয়ে পরশুরামের এমন একটা ভালো ছেলের খোঁজ সে কিভাবে পেলো! তা-ও ছেলেটি থাকতো বিদেশ। আপনারা কি ছেলেটির পরিবার সম্পর্কে কিছু জানেন?’
‘কী করে জানবো!’ নাদিয়ার মামা বললেন।
‘আমি একটু আসি’ বলে প্রথম লোকটি একটু দূরে গিয়ে কোথাও ফোন করলেন। বললেন, ‘নাদিয়ার মামা আর বড় ভাই এসেছে। এখন দোকানে আছে। আমরা ওদের সাথে কথা বলছি। ওদেরকে আপনাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেবো।’
দ্বিতীয় লোকটি আবার বলতে শুরু করলো, ‘সিজানের মতো ছেলের জন্য যার মেয়েকেই প্রস্তাব দেয়া হতো, সে রাজি হয়ে যেতো। ইন্টার পাশের পর সে লটারিতে টিকে কোরিয়া চলে যায়। তিন বছরের মাথায় এসে বাড়িতে ছয় রুমের বিল্ডিং করে। দ্বিতীয়বার গিয়ে এক বছরের মধ্যে ফেনী শহরে জমি কিনেছে। ওর কোম্পানীও নাকি ভালো। ওকে নাকি সহজে ছাড়বে না। আর ওর বড় বোন বিয়ের পর স্বামীর সাথে সুইডেন থাকে। ছোট ভাই পড়াশুনা করছে আর ছোট বোন তো নাদিয়ার সাথে এবার ফেনী কলেজ থেকে একই সাথে ইন্টার দিয়েছে। নাদিয়ার জন্য এরচেয়েও বেশি উপযুক্ত পাত্র কি আপনাদের দরকার? চলুন, আপনাদেরকে সিজানদের ঘরে নিয়ে যাই।’
‘ওর যখন বিয়েই হয়ে গেছে, এখন গিয়ে আর কী লাভ!’
‘কি বলছেন! আমরা যা বললাম, সত্য বললাম, না মিথ্যা বললাম, জানতে হবে না?
‘আচ্ছা, চলুন।’
৪৩.
সিজানদের ঘরে আসার পর রিয়া দরজা খুলে দিলো। রিয়া ওদেরকে সালাম দিলো। বললো, ‘আমিই নাদিয়ার বান্ধবী। সিজানের বোন। ভেতরে আসুন।’
‘বুঝলাম না। আপনি নাদিয়ার বান্ধবী, আবার নাদিয়া যে ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে, সে ছেলের ঠিকানাও আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন আপনি আবার এখন দেখি আপনি বলছেন, আপনি ছেলেটির বোন। বেশ গোলকধাঁধায় ফেলে দিলেন আমাদেরকে।’
‘ধাঁধান উত্তর পেয়ে যাবেন আস্তে আস্তে। আগে ভেতরে আসুন।’
ওরা ভেতরে আসার পর সিজানের বাবা-মা ভেতর থেকে ড্রয়িং রুমে এলেন। নাদিয়ার মামা এবং ভাইয়া তাঁদেরকে সালাম দিলেন। নাদিয়ার বাবা বললেন, ‘আমি সিজানের বাবা। আর এ হচ্ছে সিজানের মা।’ একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘কোত্থেকে কী হয়ে গেলো, আপনারা হয়তো এখনো সব কিছু জানেন না। আমিও প্রথমে কিছুই বুঝতে পারিনি। দোকানে কী শুনলেন, জানি না। এখন শুধু এতটুকুই বলি, ‘আমি প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক থেকে অবসরে গেছি বছর চারেক হলো। অবসরের পরের বছর আমার স্ত্রীসহ হজ করে এসেছি। এর পরের বছর সিজান কোরিয়ার লটারীতে টিকে কোরিয়া চলে যায়। রিয়া ইন্টার ভর্তির পর একদিন ঘরে এসে ওর বান্ধবী নাদিয়ার কথা বলে ওর মা’র কাছে। নাদিয়ার খুব সুনাম করে। আমি কিছু জানতাম না। সিজান এটা জেনে রিয়ার মোবাইল থেকে নাদিয়ার ফোন নাম্বার নিয়ে ওর সাথে ফোনে যোাগযোগ শুরু করে। সিজান সেদিন আমাকে বলেছে ওর নাকি ইচ্ছা ছিল, ওদের বিয়ে সামাজিকভাবেই হবে। কিন্তু যখন সে জানতে পারে, নাদিয়াকে ওর বাবা-মা বিদেশী ছেলের সাথে বিয়ে দেবে না, এমনকি নাদিয়ার অন্য জায়গায় বিয়ের কথাবার্তাও প্রায় ফাইনাল, তখন সে আমাদের কাউকে না জানিয়ে দেশে চলে আসে। আসার সময় একটি বিয়ের জন্য স্বর্ণালঙ্কার যা দরকার, নিয়ে আসে। দেশে আসার দু’দিনের মাথায় একদিন সে ফেনী যাবার কথা বলে চলে যায়। পরে ফোনে ওর মাকে জানায় নাদিয়ার সাথে ওর বিয়ের কথা। শেষে রিয়া আমাদেরকে সব বুঝিয়ে বলেছে। ’
‘নাদিয়া তো আমাকে অন্তত জানাতে পারতো।’ নাদিয়ার ভাই বললেন।
সবার কথার মাঝখানে রিয়া এবং ওর মা ভেতরে চলে গেলো।
‘জানি না কেন জানায়নি। হয়তো ভেবেছে, বাবা-মা যখন রাজি নয়, তখন ভাইকে জানিয়ে কী লাভ হবে।’ একটু থেমে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, ‘দেখুন, অনেক ছেলেমেয়ে প্রেমের নামে বিয়ের আগে অনেক খারাপ কাজ করে, অনেক ছেলেমেয়ে প্রেমের জন্য আত্মহত্যাও করে, এরা এরকম কিছুই করেনি। তাছাড়া ওরা যখন বিয়ে করেই ফেলেছে, আমরা এখন মেনে না নিয়ে কী লাভ হবে! আমরা বাবা-মা’রা অনেক সময় সন্তানের পছন্দ থাকতেও ওদের ওপর আমাদের পছন্দ চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করি। এটা কি ঠিক? এটা করে কি ওদেরকে সুখী করা যায়? এগুলো চিন্তা করে আমি পরে ওকে তেমন কিছু বলিনি। মেনে নিয়েছি ব্যাপাটা। আপনারাও মেনে নিন। দেখবেন সবকিছু ইতিবাচক মনে হবে।’
‘ঠিক বলেছেন, মেনে নেয়া যায়। এরকম বিষয়গুলো অনেকেই এখন মেনে নেয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমার বাবাকে নিয়ে। উনি এসব কিছুই বুঝার চেষ্টা করছেন না।’
‘কষ্ট করে উনাকে বুঝিয়ে বলুন। আমার বিশ^াস, ঠিকমতো বুঝিয়ে বললে তিনি বুঝতে পারবেন।’
‘ঠিক আছে। কী হয়, আপনাদেরকে জানাবো। আমরা এখন আসি।’
‘না না, কি বলছেন। এতো দূর থেকে এসেছেন। না খেয়ে যাবেন কী করে! ভেতরে আসুন।’
ডাইনিংয়ে গিয়ে নাদিয়ার ভাইয়া বললেন, ‘এতো কিছু আয়োজনের কী দরকার ছিল?’
‘কই, তেমন কিছুই তো করা হয়নি।’
৪৪.
নাদিয়ার বাবা এলেন বাড়িতে। এসেই বললেন, ‘এলাকার সবার কাছে জানাজানি হয়ে গেছে নাদিয়া পালিয়ে বিয়ে করেছে। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে একসাথে ছবি তুলে ফেসবুকে দিচ্ছে। সবাই আমাকে জিজ্ঞেস করছে ঘটনা সত্য কিনা! সমাজে বাস করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে বলছে নিজের ভাতিজি এরকম পালিয়ে বিয়ে করায় তিনি যা করেছেন, এখন তো দেখি তাঁর নিজের ঘরেও এমন কান্ড ঘটে বসেছে। এবার কী করবেন! পথঘাটে চলার সময় সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। লজ্জায় সমাজের কাউকে মুখ দেখানো কষ্টকর।’
‘কী আর করা! ভাগ্যে লেখা ছিল।’
‘রিয়াদ বাড়ি এসেছে দুপুরে, তুমি ফোন করে বলেছিলে। কোথায় গেলো? ওর সাথে দেখাও তো এখনো হলো না।’
‘এক জায়গায় পাঠিয়েছি। চলে আসবে হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে।’
‘যেখানেই পাঠাও না কেন, নাদিয়ার খোঁজে যেন না যায়।’
৪৫.
‘ফাটাফাটি খবর আছে, নাদিয়া। তাড়াতাড়ি ফোন কর ভাইয়ার মোবাইল থেকে।’ লিখে রিয়া নাদিয়ার ফেসবুকে মেসেজ করলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রিয়ার ফোন বেজে উঠলো।
‘কি এমন ফাটাফাটি খবর?’
‘তোর বড় ভাই এবং মামা এসেছিলেন একটু আগে আমাদের বাড়ি।’
‘কিভাবে খোঁজ পেলেন তাঁরা?’
‘আমি কাল ফোন করেছি তোর মায়ের নাম্বারে।’
‘আমাদের মায়ের নাম্বার আবার কোত্থেকে পেলি? কোনো সমস্যা হবে না তো?’
‘তোরা তো ফোন করতে ভয় পাস, আবার আমাকে বলছিস সমস্যার কথা। এতো কিছু চিন্তা করলে কি হয়?’
‘আচ্ছা, রাগ করিস না। কী হয়েছে বল। আগে বল আমার ফোন নাম্বার পেলি কোথায়?’
‘সেদিন বাড়িতে এসেছিস না? তুই ভয়ে দিবি না, তাই তোর মোবাইল থেকে নিয়ে নিলাম। তোরা যাবার পর দিনই ফোন করতাম। ভাবলাম, পরিস্থিতি আরেকটু ঠান্ডা হোক। তাই পরের দিনের পরের দিন ফোন করলাম।’
‘আমার মা কি বললেন?’
‘কি বলবেন আবার? তুই কোথায়, তা জানতে চাইলেন।’
‘আমি সব কিছু বুঝিয়ে বলার পর তাঁকে বললাম কাউকে আমাদের বাড়ি পাঠাতে। শেষে আজ বিকেলে তোর বড় ভাইয়া এবং তোর মামা আমাদের বাড়ি এসেছেন। আমাদের বাড়ির পাশের দোকানে এসেছেন প্রথমে। সেখানে থাকতেই অনেকে আমাদের সম্পর্কে যা বলার বলে দিলেন। শেষে দোকানের লোকেরা তাঁদেরকে আমাদের বাড়িতেও পাঠিয়ে দিলেন। এমনকি তাঁরা দোকানে আসার কথাও আমাদেরকে আগেই জানিয়ে দিলেন। আমরা প্রস্তুত হয়ে গেলাম। তাঁরা আমাদের বাড়িতে আসার পর আমার বাবা তাঁদেরকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বললেন সম্পর্কটা মেনে নিতে।’
‘শেষে কী হলো?’
‘তাঁরা বললেন, বাড়ি গিয়ে তোর বাবাকে বুঝিয়ে বলবে। দেখি শেষে কী হয়! চিন্তা করিস না। কী হয়, তোকে জানাবো। আচ্ছা, ভাইয়া কেমন আছে রে?’
‘ভালো। আচ্ছা, আমার মায়ের কাছে তোর পরিচয় দিসনি?’
‘এতো বোকা নাকি? শুধু বলেছি, আমি নাদিয়ার বান্ধবী রিয়া। কিন্তু তুই যে আমার ভাইয়ার সাথেই পালিয়ে গেছিস, তা তাঁকে বলিনি। তবে তোর মামা এবং ভাইয়া আসার পর াতাঁদেরকে এটা বলেছি।’
‘তুই তো দেখছি তোর ভাইয়ার চেয়ে কোনো অংশে কম চালাক নস।’
‘তোকে আমার ভাবি করার টার্গেট নিয়েছি না? আচ্ছা, ভাইয়াকে দে।’
সিজান ফোন হাতে নেয়ার পর পরই নাদিয়া বললো, ‘ভাইয়া, দিন পাল্টে যাবে আশা করি। আর পালিয়ে পালিয়ে থাকতে হবে না। আমি সবকিছু নাদিয়ার, ও না না, ভাবির কাছে বললাম। জেনে নিও। তোমরা এখন কোথায় আছো?’
‘মেঝো খালার বাসায়। ঠিক আছে। পরে কথা বলবো। আগে নাদিয়ার কাছে জেনে নিই তুই কী অঘটন ঘটিয়েছিস! আরেকটা কথা, নাদিয়াকে আর ‘তুই’ বলে সম্বোধন করবি না, বলে দিলাম।’
‘ওকে কি তাহলে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতে হবে? কখনোই না।’ বলে উভয়ে হাসতে লাগলো।
৪৬.
‘বাবা, আমি বাড়িতে এসেছি একটা উদ্দেশ্য নিয়ে।’ নাদিয়ার ভাই রিয়াদ বললো।
নাদিয়ার বাবা কিছুই বললেন না। শুনে রইলেন।
গতকাল নাদিয়ার এক বান্ধবী আম্মার নাম্বারে ফোন করে যে ছেলেটার সাথে নাদিয়া পালিয়ে গেছে, সেই ছেলেটার ঠিকানা বলে দিয়েছে। আম্মা আমাকে ফোন করে বলেছেন বিষয়টা। বলেছেন, গিয়ে একটু নাদিয়াকে দেখে আসতে। আমি আর বড় মামা তাই বিকেলে সেখানে যাই। গিয়ে যা শুনেছি এবং দেখেছি. আমার মনে হয়, নাদিয়ার জন্য এ পর্যন্ত এরচেয়ে বেশি উপযুক্ত পাত্রের পক্ষ থেকে প্রস্তাব-ই আসেনি।’
‘দুলাভাই, নাদিয়া ভুল ছেলেকে পছন্দ করেনি। আমরা গিয়ে অবাক হয়েছি। পুরো শিক্ষিত পরিবার। ছেলেটার ফটোও দেখেছি। বেশ হ্যান্ডসাম। থাকে কোরিয়া।’
‘পড়ালেখা কোন পর্যন্ত?’
‘ইন্টার পাশ।’ নাদিয়ার ভাইয়া বললো।
‘ইন্টার পাশ ছেলেকে তোরা বলছিস উপযুক্ত পাত্র?’
‘কেন, মাস্টার্স পাশ করলেই কি সে উপযুক্ত পাত্র হয়? আমাদের দেশে ভুরি ভুরি মাস্টার্স পাশ আছে, চাকরির পেছনে ঘুরতে ঘুরতেই চার-পাঁচ বছর শেষ হয়ে যায়। শেষে কয়জন ভালো চাকরি পায়? যদি মাস্টার্স পাশ কোনো ছেলের সাথে নাদিয়ার বিয়ে হতো, আর ছেলেটি বিশ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করতো, নাদিয়া সুখী হতো? ভালো মানুষ হওয়ার জন্য উচ্চ শিক্ষা না হলেও চলে। আমাদের দেশে বহু উচ্চ শিক্ষিত ছেলে আছে, যারা বাবা-মার সাথে সম্পর্ক পর্যন্ত রাখে না। অথচ এই ছেলেটি বিদেশ গিয়েই আগে বাবা-মা’র জন্য সুন্দর করে বাড়ি বানিয়েছে।’
‘তোমার মত কী?’ নাদিয়ার মায়ের দিকে লক্ষ্য করে নাদিয়ার বাবা বললেন।
‘আমারও মনে হয়. নাদিয়া ভুল ছেলে পছন্দ করেনি। আমরা এ সম্পর্কটা মেনে নেয়া উচিত।’
‘দেখছি তোমরা সবাই নাদিয়ার পক্ষ হয়ে গেছো। ঠিক আছে, তোমাদের সাথে একমত হলাম। তবে আমি নাদিয়াকে বউ সাজিয়ে সামাজিকভাবেই ওর শ^শুরবাড়িতে তুলে দেবো। যা আয়োজন করা দরকার, শুরু কর। আর নাদিয়াকে ফোন করে জানিয়ে দাও, দু’একদিনের মধ্যেই যেন আমাদের বাড়ি চলে আসে।’
‘খুব ভালো হবে। এতে নাদিয়াও খুশি হবে, মানুষের সমালোচনাও বন্ধ হবে।’ নাািদয়ার মামা বললেন।
‘আচ্ছা, ওদের রিংটির কী হবে?’ নাদিয়ার ভাইয়া জিজ্ঞেস করলো।
‘তা ওদেরকে ফিরিয়ে দেবো। না নিলে আর কী করবো!’
‘মা, তোমার মোবাইলে না রিয়া ফোন করেছিল? মোবাইলটা দাও। রিয়ার নাম্বারে ফোন করে ওর বাবার সাথে কথা বলবো।’
‘মেয়েটা খুব চালাক। নিজের পরিচয় না দিয়েই আমার সাথে কথা বললো।’ এই কথা বলে রিয়াদকে নিজের মোবাইলটা এগিয়ে দিলেন।
রিয়াদ ওর মায়ের মোবাইল নিয়ে রিয়ার নাম্বার বের করে রিয়াকে ফোন করে ওর সাথে কথা বলতে লাগলো।
৪৮.
‘মহা সুখবর আছে ভাইয়া, ভাবিকে ডেকে নিয়ে স্পীকার অন করে শুন।’ নাদিয়া ফেসবুক মেসেঞ্জারে ফোন করে ওর ভাইয়াকে বললো।
সিজান নাদিয়াকে ডেকে নিয়ে আনলো।
‘বল নাদিয়া, কী হয়েছে?’
‘ভাবি’র ভাইয়া এবং মামা বাড়িতে গিয়ে আমাদের সব কথা ভাবি’র বাবাকে বুঝিয়ে বলার পর তাঁর মনের সব ক্ষোভ দূর হয়ে যায়। তিনি শেষে বললেন, নাদিয়াকে খবর দেয়ার জন্য এবং বাড়ি চলে যাবার জন্য। তিনি নাকি সামাজিকভাবেই নাদিয়াকে তুলে দেবেন।’
সিজানের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে নাদিয়া বললো, ‘রিয়া, তোর ঋণ কোনো কালেই শোধ করা যাবে না।’
সিজানও বললো, ‘আমিও কখনোই তোর ঋণ শোধ করতে পারবো না বোন।’ তিনজনেরই চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো আনন্দের অশ্রু।
(১) ‘চোখেতে অনেক ছবি ভালো লাগে’ গানটির লিঙ্ক: https://www.youtube.com/watch?v=k27WkQvceX8
(লেখকের অনুমতি ছাড়া গল্পটি কোনো নাটকে বা বইতে ব্যবহার করা আইনতঃ দন্ডনীয়।)

No comments: