১.
কোনো এক মফস্বল শহরের এক কলেজ থেকে ফিরছিলো একদল ছাত্রী। সবাই হাসিখুশি, উচ্ছল। ওদের পেছন পেছন আসছিলো আরো একটি মেয়ে। একা একা। কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর মেয়েদের দল থেকে একটি মেয়ে থেমে অপেক্ষা করতে লাগলো পেছনের মেয়েটি আসার। পেছনের মেয়েটি নিকটে আসতেই ঐ মেয়েটি বললো, ‘কিরে নীলা, তুই সব সময় সবার থেকে আলাদা থাকিস কেন? আমরা একই ক্লাসে পড়ি, চলাফেরাও করবো একসাথে। সমস্যা কোথায়!’
নীলা কিছুক্ষণ নীরব থাকলো।
পরে বললো, ‘তুই ছেলে হলে আমার সমস্যাটা সহজে বুঝতে পারতি।’
‘সরি, বুঝলাম। কিন্তু এটা নিয়ে এতো সিরিয়াস হবার কী আছে?’
‘জেরিন, আমি মাঝে মাঝে ভাবি, পৃথিবীতে সব মানুষের গায়ের রং একই রকম হলে কি কোনো অসুবিধা হতো?’
‘হয়তো হতো। কিন্তু তোকে এসব নিয়ে আর ভাবতে হবে না। তুই সব সময় আমাদের সাথে একত্রে চলাফেরা করবি।’ এই বলে জেরিন নীলার হাত চেপে ধরে নিয়ে আসতে লাগলো দলের দিকে।
নীলা বললো, ‘জোর করিস না জেরিন। আমার একাকী চলতেই বেশি ভালো লাগে।’
‘সবার সাথে একত্রে চলতে তোর খারাপ লাগলে শুধু আমার সাথে চলতেও কি তোর খারাপ লাগবে?’
নীলা কিছু না বলে তাকিয়ে থাকলো জেরিনের দিকে।
২.
রাতে খেতে বসে নীলার মা নীলাকে ডাক দিলেন, ‘নীলা, খেতে আয়। খেয়ে-দেয়ে আবার পড়তে পারবি। আমরা খেতে বসেছি।’
নীলা বললো, ‘আর একটু কাজ আছে। শেষ করে আসছি।’
নীলার মা এবার নীলার বাবাকে বললেন, ‘তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল।’
‘বলো।’
‘নীলার জন্য যে ডিপিএসটা খুলেছো, সেখানে কত টাকা জমা হয়েছে?’
‘৯০ হাজারের মতো হবে।’
‘মেয়াদ পূর্ণ হবে কবে?’
‘সামনের বছরের ডিসেম্বরে। দেড় লাখ টাকার মতো পাওয়া যাবে।’
নীলার সপ্তম শ্রেণিতে পড়–য়া ছোট ভাই রেজা বলে উঠলো, ‘বাবা, তুমি নীলার জন্য ডিপিএস খুলেছো। আমার জন্য খোলোনি কেন?’
‘তোমার জন্য লাগবে না, এজন্য।’
‘তাহলে নীলার জন্য খুলেছো কেন?’
‘তুমি এখন বুঝবে না।’
রেজা আর কিছু বললো না।
নীলা পড়ার টেবিল থেকে উঠে আসার সময় শুনতে পেলো, ওর বাবা রেজাকে বলছে, ‘তুমি এখন বুঝবে না’। এই কথার পর রেজা যখন চুপ মেরে যায়, তখন নীলা এসে ওর বাবাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘রেজা কী বুঝবে না বাবা?’
‘তোমার এখন জেনে কাজ নেই।’ নীলার মা বললেন।
‘আপু, ব্যাংকে তোমার নামে একটা ডিপিএস করা আছে, সেটার কথাই আব্বু-আম্মু এতক্ষণ বলছিলেন। তোমার ভাগ্য খুব ভালো, আপু। আমিও যদি তোমার মতো মেয়ে হতাম, আমার নামেও আব্বু ডিপিএস খুলতেন!’
‘এতো কথা না বলে মনোযোগ দিয়ে খাবার খাও। গলায় কাঁটা আটকাবে। নিজেই একসময় বুঝবে, কেন তোমার নামে ডিপিএস না খুলে তোমার বোনের নামে খুলেছি।’ রেজার বাবা বললেন।
৩.
নীলা খাবার খেয়ে আবার গিয়ে পড়তে বসলো। কিন্তু পড়ায় ওর মন বসছিলো না। ও ভাবতে লাগলো, ‘এত অভাবের পরও কেন বাবা আমার নামে ডিপিএস খুলতে গেলেন? আমার বিয়েতে খরচের জন্য? একটা গরীব মেয়ের বিয়েতে এতো খরচ লাগবে? ... জানি না।’
ভাবনার মাঝখানে নীলার মা নীলাকে ডাক দিলেন, ‘নীলা, সামনে তোর টেস্ট পরীক্ষা। বসে থাকিস না। বসে থাকলে কি ভালো পাস আসবে? রেজাকেও মাঝে মাঝে পড়া দেখিয়ে দিস।’
৪.
পরদিন কলেজে যাচ্ছিল নীলা। নীলাদের পাশের বাড়ির একজন মুরুব্বিকে দেখে নীলা সালাম দিলো। লোকটি বললো, ‘কলেজে যাচ্ছো নাকি?’
‘জি¦, আঙ্কেল।’
‘কলেজে কিভাবে যাও?’
‘বাজার থেকে সিএনজিতে করে কলেজ মোড়ে নামি। বাকি এক কিলো পথ বেশিরভাগ সময় হেঁটে হেঁটেই কলেজে যাই।’
‘এবার কি ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার, নাকি পরীক্ষার্থী?’
‘এবার পরীক্ষার্থী।’
‘ঠিক আছে। কলেজে যাও। পরীক্ষা ভালো করে দিও।’
‘দোয়া করবেন।’
৫.
নীলা কিছুদূর যাবার পর নীলার বাবা বের হলেন বাড়ি থেকে। নীলার ঐ আঙ্কেল নীলার বাবাকে দেখে বললেন, ‘কেমন আছেন?’
‘ভালো। বাড়ি এলেন কবে?’
‘গতকাল রাতে। দু’দিনের ছুটি এনেছি।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘তোমার মেয়েকে দেখলাম কলেজে যাচ্ছে। মেয়েটির তো বিয়ের বয়স হয়েছে। বিয়ে কি আরো পরে দেবে?’
‘বিয়ের প্রস্তাবও তো আসছে না কোথাও থেকে। মাসখানেক আগে একটি প্রস্তাব এসেছিল। মেয়েকে দেখে ওরা তেমন কিছু না বলেই চলে গেছে। নাশতা দিয়েছি। নাশতাও করেনি। ওদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? বললো, মেয়েই আমাদের পছন্দ হয়নি।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘এই ঘটনায় মেয়েটার মনও খুব খারাপ হয়ে গেলো। বললো, বাবা, আমি বিয়েই করবো না। আমি কি এতো অল্প বয়সে তোমাদের বোঝা হয়ে গেছি? তোমরা কি আমাকে দু’বেলা খাওয়াতে পারবে না?’ কথাগুলো বলতে বলতে নীলার বাবার চোখের কোণে পানি চলে এলো।
‘শ্যামলা মেয়েদের বিয়ে দেয়াও আজাকাল বেশ কঠিন। কারণ সমাজে এখন ফর্সা মেয়ের অভাব নেই। ভেবো না, তোমার মেয়েকে বুঝিয়ে বলো, ভাগ্য ভালো হলে কারো না কারো মন পাল্টে যেতেও পারে। সব কালো মেয়ে কি আজীবন বাপের ঘাড়ে বসে থাকে? একদিন আগে বা পরে সবারই তো বিয়ে হয়ে যায়।’
‘তবে যৌতুক ছাড়া কালো মেয়েদেরকে বিয়ে দেয়া খুব কষ্টকর।’ নীলার বাবা বললেন।
‘ঠিক বলেছেন। কালো কেন, অনেক ফর্সা মেয়ের বিয়েতেও এখন যৌতুক লাগে।’
‘কী আর করবো! লাগলে যৌতুক দিয়ে হলেও মেয়েটির বিয়ে দিয়ে দেবো। দেখি, ভাগ্যে কী আছে মেয়েটির।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘ঠিক আছে। দেরি হয়ে যাচ্ছে। আসি তাহলে।’
‘আমিও একটু পর বাজারে যাবো। কিছু মুদি মালও লাগবে। তোমার দোকানে যাবো।’
‘ঠিক আছে। তাহলে দোকানে দেখা হবে।’
৬.
কলেজ শেষে বাড়ি ফিরছিলো নীলা। সাথে ওর ক্লাসমেট জেরিন। ওরা পেছনে। ওদের আগে আগে চলছে ওদের অন্য সহপাঠী মেয়েরা। ওই মেয়েদের সাথে আছে কয়েকটি ছেলেও। দু’টি ছেলে নীলাদের একটু পেছনে। ওদের একজন পেছন থেকে নীলাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো, ‘মা কালী, কেমন আছো?’
কথাটি শুনে নীলা এবং জেরিন পেছনে ফিরে দেখে দু’টি ছেলে ওদের পিছু পিছু আসছে। ওদেরকে দেখেই নীলা পেছন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। ওর মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেলো।
কিন্তু ওদেরকে কিছু বলতে যাবে, জেরিনের চোখেমুখে এমন হাবভাব দেখে নীলা ওকে বললো, ‘জেরিন, কিছু বলো না ওদের। আমি কালো বলেই তো ওরা এমনটা বলছে। কী করবো! এসব মেনেই আমাকে চলতে হবে।’
‘না, কিছু না বললে ওদের শিক্ষা হবে না। ওরা আরো বলবে।’
জেরিন পথে দাঁড়িয়ে রইলো। নীলা সামনে চলে গেলো। পেছনের ছেলেগুলো জেরিনের কাছাকাছি আসতেই জেরিন বললো, ‘কী বলেছিস তোরা?’
‘আমি কিছু বলিনি!’ নাবিল নামক ছেলেটি বললো।
‘তাহলে তুই বলেছিস এটা?’
‘ওর নাম জানা থাকলে ওকে নাম ধরেই ডাকতাম।’ সাগর নামক ছেলেটি বললো।
‘আসলে আমরা ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়েও কাউকে ঠাট্টা না করার শিক্ষা পাইনি। কালো হলে কি তাকে পথে ঘাটে অপমান করতে হবে? আমাদের কোনো আত্মীয় স্বজন কি কালো নেই? তাদেরকে নিয়ে অন্য কেউ তামাশা করলে আমাদের কেমন লাগবে? কালো হওয়া কি দোষ?’
‘ঠিক আছে, আর এমন করবো না।’ সাগর বললো।
জেরিন আর কিছু না বলে সামনে এগিয়ে চললো।
৭.
জেরিন চলে যাবার পর সাগর এবং নাবিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে লাগলো।
নাবিল বললো, ‘আমি তোকে নিষেধ করেছি, তবু তুই ওকে কথাটা বলে ফেললি! মাঝে মাঝে তুই এমন সব কাজ করে বসিস, তোর সাথে চলতে মন চায় না। মেয়েটি কালো, তাই বলে সে কি মেয়ে নয়?’
‘আচ্ছা তুই-ই বল, কালো মেয়ের সমাজে কি কোনো দাম আছে? সুন্দরী কত মেয়ে পড়ে আছে, বিয়ে হচ্ছে না।’ সাগর বললো।
‘এসব নিয়ে তোর এতো মাথাব্যথা কেন? তোকে কি কেউ কালো মেয়েদের দায়িত্ব নিতে বলেছে? নাকি বিয়ে করতে বলেছে? তুই কোনো কালো মেয়েকে বিয়ে করতে না চাইলে করিস না। কিন্তু তুই বিয়ে না করলে কি ওদের বিয়ে বন্ধ হয়ে থাকবে? তুই ক’টা মেয়েকে বিয়ে করতে পারবি? আমি তো দেখি, অনেক সুন্দর ছেলের ভাগ্যে কালো মেয়েই জোটে। তুই যদি আর কখনো ওকে নিয়ে ঠাট্টা করিস, তাহলে তোর সাথে আর সম্পর্ক রাখা যাবে না।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুই চিন্তা করিস না। আর কখনো এমন করবো না।’ একটু থেমে আবার সাগর বললো, ‘একটা প্রশ্ন আছে। জিজ্ঞেস করি?’
‘কী প্রশ্ন?’
‘মনে হয়, মেয়েটিকে তোর বেশ ভালো লাগছে। তুই কি ওর প্রতি বেশ দুর্বল!’
‘দুর্বল, আবার দুর্বল না। তোকে এখনো ওর সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। আমরা একই হাই স্কুলে পড়াশুনা করেছি। জেএসসি পরীক্ষায় আমরা দু’জনই এ প্লাস পেয়েছিলাম। আমাদের ক্লাসে মোট এ প্লাস পেয়েছিল নয় জন। নবম শ্রেণিতে ভর্তির পর রোল নং নির্ধারণের জন্য আমাদের একটি ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হয়। ঐ পরীক্ষায় আমার রোল নং হলো দুই আর ওর রোল নং হলো এক। নবম শ্রেণির প্রথম দু’পরীক্ষায়ও মোট নম্বর হিসেবে ও-ই ছিল সবার উপরে। তবে আমাদের সাথে নবম শ্রেণিতে অন্য স্কুল থেকে এসে নতুন একটি ছাত্র ভর্তি হলো। নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেলো জেরিনের ‘এক’ নিয়ে নিয়েছে নতুন ছেলেটি, ওর হয়ে গেলো ‘দুই’, আমার হয়ে গেলো ‘তিন’। ফলাফল দেয়ার পর থেকে একাধারে চার দিন জেরিন ক্লাসে আসেনি ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণে। পরে শিক্ষকরা ওর গার্ডিয়ানকে ফোন করে ওকে স্কুলে এনে অনেক বুঝিয়ে ক্লাস করাতে রাজি করান। ইন্টার থেকে তুমি ওর সাথে পড়ছো। প্রায় দু’বছর হয়ে গেলো। ক্লাসে ওর পারফরমেন্স কি কখনো তোমার চোখে পড়েনি?’
সাগর বললো, ‘আসলে কলেজে ভর্তির পর ওকে দেখার পর থেকেই ওর প্রতি আমার মনে এক ধরনের ঘৃণা কাজ করছিলো। তাই ক্লাসে ওর ভালো পারফরমেন্সকে কখনো গুরুত্ব দেইনি। তাছাড়া ক্লাসে শিক্ষার্থী অনেক বেশি হবার কারণে ভালো শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেশি। তাই কাউকে আলাদাভাবে ভালো হিসেবে চিহ্নিত করতে বেশ কষ্ট হয়।’
‘হতে পারে।’
‘আচ্ছা, নীলার কাছে ওকে নিয়ে ঠাট্টা করার জন্য ক্ষমা চাইলে কেমন হয়?’
‘দরকার নেই। এখন আবার ক্ষমা চাইতে গেলে ওর আরো খারাপ লাগতে পারে।’
‘ঠিক আছে। তোর কথাই রাখলাম। তবে তোর সাথে কথা বলে আমার দীর্ঘদিনের একটা ইগো দূর হলো। তোকে ধন্যবাদ।’
৮.
নীলার বাবা দোকানে বেচাকেনা করছিলো। নীলাদের পাশের বাড়ির যে লোকের সাথে বাজারে আসার পথে জেরিনের বাবার দেখা হলো, তিনিও দোকানে এসে কিছু কেনাকাটা করলেন।
কেনাকাটা শেষে জেরিনের বাবাকে বললেন, ‘একটু কথা ছিল। ফ্রী হয়ে নিন। আমি বসছি।’
দোকানে যেসব কাস্টমার ছিল, তারা সবাই মালামাল কিনে চলে গেলো।
‘এবার বলুন, কী বলবেন।’ নীলার বাবা বললেন।
‘নীলার বিয়ের ব্যাপারে আমার কাছে একটি প্রস্তাব আছে।’
‘সকালে দেখা হলো। বললেন না তো!’
‘তখন কোত্থেকে বলবো? আমি বাজারে আসার পথে আমার এক খালাতো ভাই ফোন করলো। সে কথায় কথায় বললো ওর ছেলের জন্য নাকি মেয়ে দেখছে। আমি তোমার মেয়ের কথা বলেছি। সে বললো, যদি ভালো মনে করেন, মেয়ের বাবার সাথে আগে কথা বলে দেখতে পারেন, মেয়ে এখন বিয়ে দেবে কিনা?’
‘সামনে নীলার ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষার আগে ওর বিয়ে নিয়ে ভাবতে চাই না।’
‘পাত্র বেশ ভালো। সব সময় এমন ভালো পাত্র পাওয়া যায় না। এখন না হয় কথা বলে রাখতে পারেন। পরীক্ষার পর না হয় বিয়ের কাজে নামা যাবে।’
‘ঠিক আছে। তবে একটা শর্তে মেয়ে দেখানো যাবে।’ নীলার বাবা বললেন।
‘কোনো কঠিন শর্ত নয় তো?’
‘মেয়েকে দেখতে হলে আমাদের বাড়িতে গিয়ে না দেখে ওর কলেজে যাওয়া-আসার পথে দেখতে হবে।’
‘এমন শর্ত কেন?’
‘কারণ মেয়েটি খুব কষ্ট পায় যখন ওকে দেখার পর পাত্রপক্ষ পিছিয়ে যায়।’
‘তাহলে বাড়িঘর দেখতে হবে না?’
‘মেয়ে পছন্দ হলে পরে বাড়িঘর দেখতে পারবে।’
‘ঠিক আছে। আমি আমার খালাতো ভাইকে বলে দেখি। আমি আবার দু’দিন পর চলে যাবো। যা করার এই দু’দিনেই করতে হবে।’
‘ঠিক আছে। আপনি কথা বলে দেখতে পারেন।’
লোকটি দোকান থেকে বের হয়ে কিছু দূর গিয়ে আবার ফিরে এলেন। এসে বললেন, ‘আপনার নাম্বারটা আমার কাছে নেই। নাম্বারটা দিলে ওদের সাথে কথা বলে আপনাকে ফোনে জানাতে পারবো।’
নীলার বাবা লোকটিকে মোবাইল নাম্বার দিলেন।
লোকটি কিছুদূর চলে যাবার পর নীলার বাবা লোকটিকে ডাক দিয়ে বললেন, ‘এই যে শুনুন। আপনাকে তো আসল কথাই জিজ্ঞেস করা হয়নি।’
লোকটি পেছন ফিরে তাকালেন। নীলার বাবার দিকে আসতে আসতে বললেন, ‘ছেলেটির কথা? আমিও ভাবছি, আপনি এখনো ছেলের বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেননি কেন?’
‘আসলে আমি মেয়েটিকে নিয়ে বেশ চিন্তিত। ওর এখন যে বয়স, সে বয়সে ওর জন্য চারদিক থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসার কথা। কিন্তু দু’একটা যা-ও আসছে, কারোই ওকে পছন্দ হচ্ছে না। কী করবো!’
‘এসব চিন্তা বাদ দেন। ভাগ্যে যা লেখা আছে, তা হবেই। আমাদের দরকার চেষ্টা করা। ছেলের বাড়ি বাংলাবাজারের দক্ষিণে এক কিলোর মতো দূরে হবে। ইন্টার পাশ। সৌদি থাকে, এটা জানি। কিছুদিন আগে দেশে এসেছে।’
‘সৌদি তো অনেকেই যায়। সবার অবস্থা তো আর ভালো নয়। ছেলেটির কী অবস্থা?’
‘তা ভালো করে জানি না। পরে আপনিই দেখা হলে ওদের থেকে জেনে নিতে পারবেন।’
‘ঠিক আছে। তাহলে আর আপনার দেরি করাচ্ছি না।’
৯.
নীলা রাতে পড়তে বসেছে। ওর ছোট ভাই রেজা ওকে বললো, ‘আপু, তোমার বিয়েতে আমি অনেক মজা করবো। পটকা ফোটাবো, রং মাখামাখি করবো, আরো কত কিছু! তোমার বিয়ে হচ্ছে না কেন?’
‘আমার বিয়ে হয়ে গেলে তুই খশি হবি মনে হয়?’
‘খুশি হবো না। তবে আমি আব্বুকে বলবো তোমাকে যেন দূরে বিয়ে না দেয়। তাহলে প্রতিদিন তোমার শ^শুর বাড়ি যেতে পারবো, তোমাকে দেখে আসতে পারবো।’ একটু থেমে রেজা আবার বললো, ‘আর আমি না চাইলেও একদিন না একদিন তোমার বিয়ে তো হবেই! কী বলো?’ ‘আমাদের বাড়িতে আমি কখনো কোনো বিয়ে দেখিনি। আমাদের ক্লাসে যারা পড়ে, তারা প্রায়ই তাদের ভাই-বোনের বিয়ে হওয়ার কথা বলে। আমার খুব খারাপ লাগে। আমি তখন শুধু তোমার বিয়ের কথা ভাবতে থাকি। আচ্ছা আপু, তুমি তো এখন বড় হয়েছো। ইন্টারে পড়ছো। এখনো তোমার বিয়ে হচ্ছে না কেন? আমার অনেক ক্লাসমেটের বোন ইন্টারে উঠতেই বিয়ে হয়ে গেলো।’
রেজার কথা শুনে নীলার চোখে পানি চলে এলো। সে ভাবতে লাগলো, ‘আমার ভাগ্য এতো খারাপ কেন! আমার বান্ধবীদেরকে প্রতিদিনই কেউ না কেউ দেখতে আসে। অনেকের বিয়েও হয়ে যায়। আর আমাকে কেউ দেখতেও আসতে চায় না। আমার গায়ের রংটা আমার এতো শত্রু হয়ে গেলো কেন? গায়ের রংটা সাদা হতে পারতো না!...’
‘আপু, কী ভাবছিস? আমি ঠিক করে রেখেছি, তোর বরকে আমি নিজ হাতে ফুলের মালা পরাবো। আমাদের গাঁদা ফুল গাছ আছে না? সেগুলোর ফুল দিয়ে মালা বানাবো।’
‘যদি আমার বিয়ের সময় গাঁদা ফুল গাছে ফুল না থাকে?’
‘তাহলে বাজার থেকে ফুল কিনে এনে মালা বানাবো। আমি ফুল কেনার টাকা জোগাড় করেও রেখেছি আম্মুর কাছে।’
নীলা ভাবতে থাকে, ‘তোর ফুল কিনতে কিনতে আরো কতো বছর লেগে যায়, ঠিক নেই। হয়তো আমার বরকে তোর কখনোই ফুলের মালা পরানোর সুযোগ হবে না।’ এসব ভাবতে ভাবতে মনের কষ্টে নীলার চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি পড়ে গেলো। নীলার চোখ থেকে পানি পড়তে দেখে রেজা বললো, ‘আপু, কাঁছিস কেন? আমার কথায় কষ্ট পেয়েছিস বুঝি? ঠিক আছে আর কখনো তোর বিয়ের কথা মুখে আনবো না।’
নীলা ওড়না দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে, ‘কাঁদছি না। ইদানিং আমার চোখে হঠাৎ করে পানি চলে আসে। ঠিক আছে, তুই পড়তে বস। টাকা জোগাড় করতে থাক। আজ নয়তো কাল, আমার বিয়ে তো হবেই।’ নীলা মনে মনে বলে, ‘আমার কখনো বিয়ে না হলেও একদিন এ বাড়িতে তোর বিয়ে তো হবেই। আমার বরের গলায় ফুলের মালা পরাতে না পারলেও তোর বউয়ের গলায় তো নিশ্চয়ই পরাতে পারবি!’
১০.
রাতে নীলার বাবা খেতে যাবেন, এমন সময় তাঁর মোবাইল বেজে উঠলো। ফোন রিসিভ করার পর ও প্রান্ত থেকে আওয়াজ এলো, ‘কেমন আছেন?’
‘ভালো। কী খবর?’
‘আপনার সাথে বাজারে কথা বলার পর ওদেরকে ফোন করে আপনার শর্তের কথা বলেছি। ওরা আর দেরি করেনি। আজ কলেজে গিয়ে আপনার মেয়েকে দেখে এসেছে। বলেছে, মোটামুটি পছন্দ হয়েছে। এখন বলছে আপনাদের বাড়ি দেখতে যাবে। ওদেরকে কবে আসতে বলবো?’
‘ওদেরকে কি বলেছেন, মেয়ের সামনে ইন্টার পরীক্ষা?’
‘বলেছি। ওরা বলেছে, অসুবিধা নেই, সব ঠিকঠাক থাকলে এখন শুধু কথাবার্তা ফাইনাল করে রাখা হবে। পরীক্ষা শেষ হলে বিয়ে হবে।’ একটু থেমে অন্যপ্রান্তের লোকটি আবার বললেন, ‘ওদেরকে আপনাদের বাড়ি আসার তারিখ দেবো কবে?’
‘আপনি কি আগামী পরশু বাড়ি থাকবেন?’
‘না, আমি পরশু সকালেই চলে যাবো।’
‘তাহলে কাল বিকেলে ওদেরকে আসতে বলুন। ছেলেটিকেও যেন সাথে করে নিয়ে আসে।’
নীলার বাবা যখন ফোনে কথা বলছিলেন, তখন তাঁর ছেলে রেজা এসে তাঁর পাশে দাঁড়ালো। ওর বাবার কথা শেষ হতেই দৌড় দিলো ওর বোনের নিকট। গিয়ে বললো, ‘আপু, আপু, তোর বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে। আব্বু ফোনে কার কাছে জানি বলেছে, তোর পরীক্ষার পরই বিয়ের অন্ষ্ঠুান হবে। আমার কাছে কী যে আনন্দ লাগছে!...’
‘থামবি? এভাবে হৈ হুল্লোড় করছিস কেন? মনে হয় আজই আমার বিয়ে! যে দিন বিয়ে, সেদিন আনন্দ করিস। এখন খেতে যা। সবাই খেতে বসেছে।’
নীলার ধমকে রেজার মন খারাপ হয়ে গেলো। ও গিয়ে ওর আম্মার কাছে বললো, ‘আম্মু, আপু আমাকে বকা দিয়েছে ওর বিয়ের কথা বলাতে। আমি কী দোষ করলাম? বাবাকেই তো একটু আগে দেখলাম ফোনে ওর বিয়ের কথা বলছে।’
‘কিছু মনে করিস না। ওর হয়তো কোনো বিষয়ে মন খারাপ। এখন খেতে বস। আমি ওকে জিজ্ঞেস করবো।’
‘নীলা, কাল বিকেলে তোকে দেখতে আসবে।’ খেতে বসার পর নীলাকে ওর মা বললেন।
‘কে দেখতে আসবে?’ নীলা বললো।
‘একটা বরপক্ষ। ওদের বাড়ি বাংলাবাজারের দক্ষিণে।’
‘আমাকে দেখার কী আছে? আমি দেখতে কেমন, এটা আমাদের এলাকার সবাই জানে। আমার সম্পর্কে আমাদের এলাকার কারো কাছ থেকে জেনে নিলেই তো হয়!’
‘আসলে তোকে দেখতে আসবে না।’
‘তাহলে কেন আসবে?’
‘দেখতে আসবে আমাদের বাড়িঘর, পরিবেশ। তোকে ওরা আজ কলেজে দেখে নিয়েছে তোর অজান্তে।’ নীলার বাবা বললেন।
‘আমাকে যখন দেখেছে, তখন আবার আমাদের বাড়িঘর দেখার কী প্রয়োজন? কেন, ওরা কি মনে করে আমাদের বাড়িঘর নেই? আমরা খোলা আকাশের নিচে থাকি?’ নীলা মন খারাপ করে বললো।
‘না, না। এমনিতে। বিয়ের সময় মেয়েদের বাড়িঘর দেখার একটা প্রচলন আছে। আমরাও ওদের বাড়িঘর দেখবো।’
‘অসুবিধা নেই। দেখতে মনে চাইলে দেখুক। আমাকে কি আবারও দেখবে?’
‘তা জানি না। হয়তো দেখবে না। দেখতে চাইলে তুই দেখা দিবি?’
‘তোমাদের ইচ্ছা।’
১১.
খাওয়া শেষে নীলা পড়তে চলে গেলো। গিয়ে ওর ভাইকে বললো, ‘তুই পড়। আমার ভালো লাগছে না। আমি একটু শুই।’
নীলা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। ভাবতে লাগলো, ‘শেষ পর্যন্ত আমাকে তাহলে পছন্দ হয়েছে একটা বর পক্ষের! ছেলে কী করছে, দেখতে কেমন, কিছুই জানি না। এটাই আমাদের দেশের রীতি। আগে ছেলেপক্ষ মেয়ে দেখে। মেয়ে দেখার মাধ্যমেই শুরু হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। অনেকটা কোরবানীর ঈদের বাজারে গরু দেখার মতো। জানি না, আমাকে কেন ওদের পছন্দ হলো! ছেলে যেমনই হোক, আমি রাজি হয়ে যাবো। একদিকে বাবা-মায়ের বোঝা হয়ে গেছি মনে হয়, অন্যদিকে ছোট ভাইটিও বাড়িতে কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান দেখার জন্য হা-হুতাশ করছে। সবার চাহিদা পূরণ হবে আমার বিয়ে হলে।’
১২.
পরদিন কলেজ ছুটির পর নীলা ওর বান্ধবীর সাথে হেঁটে হেঁটে সিএনজি স্টেশনের দিকে আসছিলো। ওদের পেছন পেছন আসছিলো সাগর এবং নাবিল। কিছুদূর যেতেই সাগর জেরিনকে ডাক দিলো। নাবিল বললো, ‘ওকে ডাকছিস কেন?’
‘তোকে কি বলতে হবে?’
‘উল্টাপাল্টা কিছু করে বসিস না আবার।’ নাবিল বললো।
জেরিন কাছে আসার পর সাগর একটি প্যাকেট এগিয়ে ধরে ওকে বললো, ‘এটা নীলাকে দিস। খুলবি না কিন্তু।’
‘ঠিক আছে।’ বলে নীলার দিকে এগিয়ে চললো জেরিন। সাগর এক জায়গায় বসে ওর বন্ধু নাবিলের সাথে কথা বলতে লাগলো। নাবিল বললো, ‘ওকে আমার সেই ক্লাস নাইন থেকেই ভালো লাগছে। ওর গায়ের রং কালো হলেও চেহারায় দারুণ আর্ট। এসএসসি পরীক্ষার কিছুদিন আগে একদিন আমার ভাবিকে বললাম, ভাবি, একটি মেয়েকে আমার খুব ভালো লাগছে। কী করবো? তুমি কি মা’কে একটু বলবে? আমার মনে হয়, জীবনে কোনো মেয়েকে আমার এতো ভালো লাগবে না।’
ভাবি কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, ‘ছেলেমেয়ে একসাথে পড়ালেখা করতে গেলে যে কোনো ছেলে যে কোনো মেয়ের প্রেমে পড়ে যেতে পারে। যে কোনো মেয়েও যে কোনো ছেলের প্রেমে পড়ে যেতে পারে। মেট্রিক বা ইন্টারে পড়া অবস্থায় এমন হওয়াটা ক্রাশ ছাড়া কিছু নয়। অনেক মহিলা শিক্ষককেও অনেক ছাত্রের পছন্দ হয়ে যেতে পারে। অনেক পুরুষ শিক্ষককেও অনেক মেয়ের ভালো লেগে যেতে পারে। হয়ও অনেক সময়। কী বলিস?’
‘ঠিক বলেছো।’
একটু থেমে ওর ভাবি আবার বললেন, ‘পাঁচ বা দশ বছর বয়সী একটি শিশুকে বিয়ে করানোটা যেমন ঠিক নয়, তেমনি, তুই মেচিউরড হলেও কী হবে, তোকে এখন বিয়ে করানোটাও সেরকম ঠিক নয়। আচ্ছা বল, তুই যদি এখন বিয়ে করিস, তুই কি একটি সংসার চালাতে পারবি?’
‘পারবো না। কিন্তু...’
‘আগে পড়ালেখা শেষ হোক, একটা ভালো চাকরি পেলে এরকম ভালো একটা মেয়ে খুঁজে নিস। হয়তো আরো বেশি পছন্দের মেয়েও তখন পেয়ে যেতে পারিস ভাগ্য ভালো হলে। আর তুই না চাইলেও আমরাই তখন তোর জন্য ভালো দেখে একটি মেয়ে খুঁজে নেবো।’ একটু থেমে ওর ভাবি আবার বললো, ‘আমাদের প্রতি তোর এই বিশ্বাসটা নেই?’
‘অবশ্যই আছে। কিন্তু...’
‘কোনো কিন্তু-টিন্তু নেই। ঘরের কাউকে তোর এই কথাটা বললে সবাই কী ভাববে, ঠান্ডা মাথায় একটু চিন্তা করে দেখিস।’
‘ঠিক আছে ভাবি, তাহলে ভাগ্যের ওপরই ছেড়ে দিই বিষয়টা।’
‘ভাগ্যে বিশ^াস রাখ। ভাগ্য তোর পক্ষে হলে যে কোনো ইচ্ছে পূরণ হতে পারে।’
নাবিলের কথা শেষ হলো। কিছুক্ষণ পর সাগর বললো, ‘তোর সাথে বন্ধুত্ব সেই ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার থেকে। এতোদিন আমাকে কথাগুলো বলিসনি কেন?’
‘বলিনি। কারণ তুই হয়তো আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করবি, এই জন্য। আমি তো তোর মেন্টালিটি বুঝি। কালো মেয়েদের প্রতি তোর অনীহা তো সেদিন নিজেই প্রকাশ করলি। আমি ভাবতেও পারিনি তুই এমন একটা কান্ড করে বসবি।’ নাবিল বললো।
‘আসলে সেদিনের পর থেকে আমার ধারণা পরিবর্তন হতে শুরু করলো। এখনো ঘটনাটি মনে হলে নিজের কাছে নিজেই লজ্জিত হই। একটা বিষয় ইদানিং আমার মনে আসে প্রায়ই, কালো হওয়াটা মোটেই দোষণীয় নয়। তবু দেখতে ভালো না লাগার কারণে আমরা কালো মানুষগুলোকে অনেক সময় অবজ্ঞা করি। ওদের সাথে আমাদের ডিফারেন্স শুধুই ত্বকের রংয়ে, আর কোথাও নয়।’
‘ঠিক বলেছিস। আমি ভাবি কি জানিস? আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছে, দেখতে সুন্দর। কিন্তু তাদের কাজকর্ম খুব খারাপ। এসব মানুষ সুন্দর হওয়া সত্ত্বে মানুষ এদেরকে দেখতে পারে না। আবার কিছু মানুষ আছে, যারা দেখতে কালো হলেও তাদের কাজের কারণে, তাদের আচরণে মানুষ তাদের উপর খুব সন্তুষ্ট। কালো হবার কারণেও তারা সমাজে জনপ্রিয়। তাহলে কালো মানুষকে আমরা অবজ্ঞা করার কী আছে!’
‘অনেক কথা হলো। চল, এবার বাসায় ফিরি।’ সাগর বললো।
১৩.
পরদিন বিকেলে নীলাদের বাসায় ছেলেপক্ষ আসে। নীলার মা ওদের জন্য কয়েক পদের পিঠা তৈরি করেন। আপ্যায়ন শেষে ছেলের বাবা নীলার বাবাকে বললেন, ‘নীলা কোথায়? আমাদেরকে একটু দেখানো যাবে? কাল কলেজ থেকে আসার পথে আমার ছেলে ওকে দেখেছে। আমি তো এখনো দেখিনি। তাছাড়া রাস্তঘাটে দেখা আর বাসায় দেখা এক কথা নয়।’
নীলার বাবা ‘ঠিক আছে। আমি ওকে নিয়ে আসছি’ বলে ভেতরে গিয়ে নীলাকে ডেকে আনলেন। নীলা এসে সবাইকে সালাম দিলো। ছেলের বাবা নীলাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমাদের ফাইনাল পরীক্ষা কবে?’
‘আগামী মাসের ৫ তারিখ থেকে শুরু।’
‘আমাদের ছেলে তোমার সাথে একটু কথা বলতে পারবে?’ ছেলের বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
নীলা ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়লো।
নীলাকে দেখতে আসা ছেলেটি নীলার সামনেই উপবিষ্ট ছিল। সে বললো, ‘আমার নাম রাহাতুল ইসলাম। আমি সৌদি থাকি। তিন বছর পর দেশে এসেছি।’
ছেলেটির দিকে নীলা একবার তাকিয়েই আবার মুখ নিচু করে ফেললো। ছেলেটিও বেশি সুন্দর নয়। শ্যামলা।
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বললো না। শেষে ছেলেটি নীলার দিকে এক হাজার টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘এটা নিন।’ নীলা প্রথমে নিতে চাইলো না। পরে ছেলেটির বাবা বললেন, ‘নাও, মা। ও খুশি হয়ে তোমাকে দিয়েছে।’
নীলা কিছুটা ইতস্তত করে টাকাটা হাতে নিলো।
ছেলের বাবা বললেন, ‘আমরা তাহলে আসি। আপনারা কখন আমাদের বাড়ি আসবেন? আপনারা আমাদের বাড়ি যাওয়ার পর যদি আমাদেরকে পছন্দ হয়, তখন সেখানেই বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে কথা বলা যাবে।’
নীলার বাবা বললেন, ‘আমরা কোন দিন গেলে আপনাদের সুবিধা হয়?’
‘সামনের শুক্রবারেই আসুন। আমার এক ভায়রাও থাকবেন। শুক্রবার ছাড়া তিনি সময় দিতে পারবেন না।’ একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘শুক্রবার দুপুরেই আসুন। দুপুরের খাবার আমাদের বাড়িতে খাবেন।’
‘না, না আমরা বিকেলে যাবো। গরম যেভাবে পড়ছে, এখনকার দিনে দুপুরের আগে কোথাও বের হওয়া বেশ কষ্টকর।’
‘ঠিক আছে, আপনাদের যখন সুবিধা হয়।’
১৪.
সন্ধ্যায় পড়তে বসার পর নীলার মোবাইল (ফিচার ফোন) বেজে উঠলো। নীলা ফোন রিসিভ করার পর ও-প্রান্ত থেকে নীলার বান্ধবী জেরিন বললো, ‘নীলা, তুই আজ এতো তাড়াহুড়া করে বাড়ি চলে গেলি কেন? ছুটির পর দেখলাম তুই নেই। তোর মোবাইলেও কল ঢুকছিল না। তোকে অনেক খুঁজলাম। শেষে নাবিল বললো, তোকে নাকি বাড়ি চলে যেতে দেখেছে।’
‘আমার মোবাইল তো খোলাই ছিল। গাড়িতে থাকার সময় হয়তো কল করেছিস।’
‘আমাকে না বলে চলে গেলি কেন? কোনো জরুরী কাজ ছিল?’
‘তোকে বলেই আসতাম। কিন্তু ছুটির পর হঠাৎ তোকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ভাবলাম, হয়তো ওয়াশরুমে গিয়েছিস। এজন্য ফোনও করিনি। পরে ফোন করতেও ভুলে গেছি।’
‘কেন এমন তাড়াহুড়ো করে বাড়ি চলে গেলি? কোনো মেহমান আসার কথা ছিলো বাড়িতে?’
‘না। সেরকম কিছু না।’ নীলা বললো।
‘আমাকে বলা যাবে না? কিছু লুকাচ্ছিস মনে হয়!’
‘বলা যাবে। কিন্তু বলতে ইচ্ছে করছে না।’
‘বললে কি কোনো সমস্যা হতে পারে?’
‘আচ্ছা বলছি। তুই তো দেখছি না জেনে ছাড়বি না।’ একটু থেমে নীলা আবার বললো, ‘আজ একটা ছেলেপক্ষ আমাকে দেখতে এসেছে।’
‘এজন্যই লুকাচ্ছিস! তোকে কি ওদের পছন্দ হয়েছে? বিয়ের দিন-তারিখ সব কি ঠিক হয়ে গেছে?’
‘আরে না না, এসব কিছুই না। দিন-তারিখ ঠিক হলে তোকে তো অবশ্যই ফোনে জানাতাম। ওরা আমাকে দেখে গেছে শুধু। সামনের শুক্রবারে আমাদেরকে ওদের বাড়ি যেতে বলেছে।’
‘তাহলে তো নিশ্চয়ই তোকে পছন্দ হয়েছে। পছন্দ না হলে ওরা কি তোদেরকে ওদের বাড়ি যেতে বলতো?’
‘জানি না।’
‘এটা জানার কিছ্ইু নয়। এটা বুঝার বিষয়। আমার সাথে লুকোচুরি করিস না। তোকে কি আংটি পরিয়ে গেছে?’
‘আংটি পরায়নি, আমাকে এক হাজার টাকা দিয়েছে।’
‘আমি তোকে তো প্রায়ই বলি, কোনো না কোনো পক্ষ তোকে পছন্দ করবেই। তুই কি দেখতে এতোই খারাপ? এখন দেখ, আমার কথা সত্য হয়েছে কিনা!’
‘তুই যেভাবে বলছিস, মনে হয় আমার বিয়েই হয়ে গেছে!’
‘বিয়ে না হলেও তো হবার পথে। মানুষ রান্না করে চাল। কিন্তু কেউ যদি জিজ্ঞেস করে ‘কী করছেন?’, তখন বলে, ‘ভাত’ রান্না করছি। অথচ মাত্র রান্না বসিয়েছে। এখনো ভাত হতে অনেক দেরি। মানুষ ছেলের জন্য দেখতে যায় মেয়ে, কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে, ছেলের জন্য ‘বউ’ দেখতে গিয়েছি। এভাবে তোর বিয়েও তো হবার পথে। তাই, ‘বিয়ে হয়ে গেছে’ বললেও ভুল হবে না, কী বলিস?’
‘তোর এসব যুক্তি রাখ। আমার মতো একটা মেয়ের বিয়ে হবে, এখনও তা ভাবতে আমার কষ্ট হয়।’
‘এখন যা-ই বলিস, সামনের শুক্রবারের পর আমার মনে হয় তোর মুখে এমন কথা আর শোনা যাবে না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। দেখা যাবে। এখন রাখ। সন্ধ্যার পর থেকে এখনো কোনো সাবজেক্ট-ই পড়া হয়নি।’
‘ঠিক আছে, রাখছি। সামনের শুক্রবারের অপেক্ষায় থাকলাম। জানাবি কিন্তু। রাখি।’
১৫.
পরদিন সিএনজি স্টেশন থেকে কলেজে যাবার পথে জেরিন নাবিলকে দেখে পেছন থেকে ডাক দিলো। নাবিল জেরিনের ডাক শুনে থেমে গেলো।
‘একটা ভালো খবর আছে।’ জেরিন বললো।
‘কী খবর। তাড়াতাড়ি বল। ভনিতা করিস না। আমার আবার এসব বিষয়ে দেরি সহ্য হয় না।’
‘নীলার বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে। ছেলেপক্ষ ওকে দেখে গেছে। সামনের শুক্রবার নীলার বাবা ছেলেদের বাড়ি যাবে। ওখানেই নাকি বিয়ের কথাবার্তা ফাইনাল হবে।’
জেরিনের কথা শোনার পর নাবিল কোনো কথা না বলে থেমে রইলো। সাগর কোন্ দিক থেকে এসে বললো, ‘এই, তোরা কিসের কথা বলছিস এখানে বসে বসে?’
‘কেন, নীলার বিয়ের কথা। নীলার বিয়ের কথাবার্তা অনেকটা ফাইনাল।’
‘কী বলছিস?’ সাগর যেন অনেকটা হতাশ হয়ে বললো। কিন্তু কাউকে বুঝতে দিলো না ওর হতাশা।
নীলা যা জানে সব ওদেরকে খুলে বললো।
শেষে বললো, ‘নাবিল, তোকে প্রথমে নীলার বিয়ের কথা বলাতে তোর মুখ এমন ফ্যাকাসে হয়ে গেলো কেন?’
‘ও বলবে না। আমি বলছি।’ সাগর বললো।
‘আচ্ছা, বল।’ জেরিন বললো।
‘ও নীলাকে স্কুল জীবন থেকে পছন্দ করে। নীলাকে ভালো লাগার কথা ও ওর ভাবিকে একবার বলেছেও। কিন্তু ওর ভাবি ওকে এই বয়সে এসব যে সঠিক নয়, তা ভালোভাবে বুঝিয়ে বলায় ও বিষয়টা আর বাড়ায়নি। নয়তো শেষে ঘটনা কোন্ দিকে গড়াতো, কে জানে! এতোদিনে হয়তো ওরা বিয়ে করে কয়েকটা বিয়ে বার্ষিকীও পালন করে ফেলতো! আর কিছু বললাম না!’ এসব বলে হাসতে থাকলো সাগর।
‘আচ্ছা, তুইও কি ওকে পছন্দ করিস না? শুধু আমার কথা কেন বলছিস?’ নাবিল সাগরকে জিজ্ঞেস করলো।
‘আমি? নীলাকে?’
‘এমনভাবে কথা বলছিস, যেন মাছ থেকে কাঁটা ছড়াতেও জানিস না! তুই সেদিন ওকে কী দিয়েছিস? লাভ লেটার, নাকি অন্য কিছু? প্যাকেটটা এতো বড় হলো কেন? কী ছিল ভেতরে?’
‘আচ্ছা, তুই নিজেই বুঝিস, এখন আমাদের বিয়ের সময় নয়। তবু আমার প্রতি তোর এমন ধারণা হলো কী করে! ওকে ভালোবেসে আমার এখন কী লাভ হবে? বিয়ে করতে পারবো?’ সাগর বললো নাবিলকে।
নীলাকে এদিকে আসতে দেখে জেরিন বললো, ‘নীলা এদিকে আসছে। ক্লাসেরও সময় হয়ে গেছে। চল।’
১৬.
কলেজ ছুটির পর জেরিন নীলাকে বললো, ‘নীলা, একটা কথা শুনবি?’
নীলা জেরিনের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো।
‘তুই হয়তো জানিস না, নাবিল তোকে স্কুলজীবন থেকেই ভালোবাসছে। কিন্তু সাহস করে তোকে কখনো কিছু বলতে পারেনি। কথাটা একদিন সে ওর ভাবিকে বলায় ওর ভাবি ওকে এ ব্যাপারে বুঝিয়ে বলে। তাই সে আর সামনে পা বাড়ায় নি।’ একটু থেমে জেরিন আবার বললো, ‘তোকে একটা প্রশ্ন করার ছিল। কিন্তু এখনো করা হয়নি। সাগর তোকে সেদিন প্যাকেটে করে কী দিল রে?’
‘কী দেবে আর! ওর আচরণের জন্য দুঃখিত হয়ে ক্ষমা চাওয়ার কথা একটি কাগজে লিখে দিয়েছে।’
‘সেটা কি বড় চিঠি ছিল? কয় পৃষ্ঠার চিঠি ছিল? তুই সব কিছু আমার কাছ থেকে লুকাচ্ছিস।’
‘চিঠি কেন হবে? একটি কাগজে লিখে দিয়েছে, ‘দুঃখিত’। আরো দু’একটা বাক্য অবশ্য লিখেছে। তা বলে আর কী লাভ! এবার কি তাহলে বলবি, সাগরও আমাকে পছন্দ করে? তুই এসব আজগুবি কথা কোত্থেকে বলিস!’
‘আজগুবি? তোকে আজগুবি খবর দিয়ে আমার কী লাভ! আচ্ছা, বললি না তো, সাগর তোকে কাগজটির সাথে আর কী দিয়েছে? প্যাকেটটি এতো বড়...’ জেরিন প্রশ্ন করা শেষ করতে না করতেই নীলা বললো, ‘আমার কথা রেখে এবার তোর কথা বল। তোর বোনের হবু বর দেশে ফিরবে কবে?’
‘বলিস না। এ পর্যন্ত কয়েকটা তারিখ মিস করলো। আরিফও এ ব্যাপারে খুব অসন্তুষ্ট। বলছে, আপুর বিয়ের যদি আর ছয় মাস দেরি হয়, তাহলে আমরা সবাইকে রাজি করিয়ে বিয়ে করে ফেলবো। কিন্তু আমি আরিফকে বলেছি, এটা ঠিক হবে না। বিদেশের মানুষের ছুটিছাটা নিয়ে অনেক অসুবিধা হয়। তোমার ছুটি নিয়ে তো অসুবিধা নেই। যদি আপুর বিয়ে হতে একবছরও লেগে যায়, যাক। আপুর বিয়ের আগে আমরা বিয়ে করা ঠিক হবে না। আপুর বিয়ে হয়ে গেলে আমরা আর একমাসও দেরি করবো না।’
‘ভালোই। ইন্টার পাশ করলে আমরা কে কোথায় ভর্তি হই, ঠিক নেই। যেখানেই থাকি, বিয়ের তারিখ ঠিক হলে কিন্তু জানাবি। দাওয়াত না দিলেও চলে যাবো। কি বলিস?’
‘তুই তো তখন তোর শ^শুরবাড়ি থাকবি। তোকে কি আর খুঁজে পাওয়া যাবে?’
‘আমি কখনো এডভান্স চিন্তা করি না। বিশেষ করে আমার বিয়ের ব্যাপারে। আমার মনে হয়, আমার সহজে বিয়ে হবে না।’
‘ঠিক আছে। দেখা যাবে।’
১৭.
নীলা রাতে পড়ালেখা শেষ করে শুয়ে গেলো। শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকলো, ‘নাবিল আমাকে স্কুল জীবন থেকে ভালোবাসে? কখনো তো বুঝতেই দেয়নি আমাকে। নাবিল আমাকে ভালোবেসে কী লাভ হবে! নাবিল তো আমাকে বিয়ে করতে পারবে না। ওর ভাবিও তো ওকে এই বিষয়টাই বুঝিয়ে দিয়েছে। আর এটাই বাস্তব।’ কথাগুলো ভেবে নীলা সাগরের দেয়া প্যাকেটটি হাতে নেয়। ভাবে, ‘সাগর এটা কেন দিয়েছে আমাকে? ওর অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্য হিসেবে, নাকি আমাকে ভালোবেসে। কিন্তু আমাকে ভালোবাসার কী আছে? একটা কালো মেয়েকে কি কেউ ভালোবাসতে পারে? ভালোবাসা তো এসেছে সুন্দর মেয়েদের জন্য। তাছাড়া নাবিল আর সাগর তো একই লেবেলের। আমার ক্লাসমেট। নাবিল যদি আমাকে ভালোবেসে কোনো লাভ না হয়, সাগরের কী লাভ হবে!’ এসব ভাবতে ভাবতে নীলার ঘুম এসে যায়।
১৮.
নীলাদের ঘরে নীলাকে এঙ্গেজমেন্টের রিং পরিয়েছে লিটন। সেখানে আছে নীলার মা, নীলার বাবা, নীলার মামা। আছে লিটনের ছোট ভাই, বাবা, মা এবং খালু। সবাই খুশি। নীলার বাবা সবাইকে মিষ্টিমুখ করাচ্ছেন। এসময় দরজায় কলিং বেলের শব্দ হলো। নীলার বাবা দরজা খুলে দিলেন। নীলার ক্লাসমেট নাবিল নীলার বাবাকে সালাম দিয়ে বললো, ‘আমি নীলার ক্লাসমেট। একটু ভেতরে আসতে পারি?’
‘এসো।’
নাবিল এসেই নীলার হাত থেকে রিংটি খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। বললো, ‘নীলাকে আমি ভালোবাসি। ওকেই আমি বিয়ে করবো।’ এই বলে নাবিল ওর পকেট থেকে একটি রিং বের করে নীলার হাতে পরিয়ে দিলো। নীলার বাবা বললেন, ‘এই ছেলে, তুমি কী করছো? এতো সাহস তোমার হলো কেত্থেকে? তুমি আমার বাড়ি এসে আমাকে না বলে আমার মেয়ের হাতে রিং পরাও!’
নীলার বাবা কথাটি বলতে না বলতেই খোলা দরজা দিয়ে সাগর নীলাদের ঘরে ঢুকে গেলো। সে এসেই নীলাকে ‘তোমাকে এই রিং পরিয়েছে কে?’ বলেই রিংটি খুলে ফেলে দিয়ে নিজের পকেট থেকে একটি রিং বের করে নীলাকে পরাতে যাবে, এমন সময় লিটন এবং নাবিল ওকে ধরে ফেললো। নীলার বাবাও সাগরের হাত থেকে রিংটি নেয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। শুরু হলো তাদের ধস্তাধস্তি। সবাই হৈ-হুল্লোড় করতে লাগলো।
১৯.
নীলার বাবা এবং মা ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন। হঠাৎ ওর মা জেগে গেলেন একটি গোঙ্গানীর আওয়াজ শুনে। জেগেই বসে গেলেন। শুনতে পেলেন, ঘুমের ঘোরে নীলার গোঙ্গানীর শব্দ হচ্ছে। তাড়াতাড়ি নীলার বিছানার পাশে গিয়ে নীলাকে ডাকতে লাগলেন, ‘নীলা, এই নীলা, এমন করছিস কেন?’
মায়ের উচ্চ শব্দের ডাকে নীলা জেগে গিয়ে বসে গেলো। বললো, ‘মা, খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। মনে হচ্ছিলো, ঘটনাটি বাস্তবেই ঘটছে। এখন দেখি তা স্বপ্ন ছিল। কী যে কষ্ট হচ্ছিলো!’
নীলার মা বললেন, ‘সবাই মাঝে মাঝে এমন দুঃস্বপ্ন দেখে। যা, ঘুমিয়ে পড়।’
২০.
যার সাথে নীলার বিয়ের ব্যাপারে কথা হচ্ছিলো, নীলার বড় মামাকে সাথে নিয়ে নীলার বাবা ওদের বাড়িতে গেলেন পরের শুক্রবার বিকেলে। ছেলেদের ঘরে বসে নীলার বাবা ছেলের বাবাকে বললেন, ‘ইনি হচ্ছেন নীলার বড় মামা। নীলার মামারা চার জন। আর তিনজনের কাউকে আনতে পারলাম না। আর আমার কোনো ভাই নেই। বোন আছে দু’জন। ওদের কারো স্বামী বাড়িতে নেই।’
‘আর ইনি হচ্ছেন আমার ছোট ভায়রা।’ ছেলেটির বাবা একজন মধ্যবয়সী লোককে দেখিয়ে বললেন। একটু থেমে আবার বললেন, ‘অন্য কাউকে বলেও এই অনুষ্ঠানে রাখতে পারিনি। সবাই বলেছে, পরের অনুষ্ঠানে আসার চেষ্টা করবে।’
এরই মধ্যে নাশতা নিয়ে প্রবেশ করলো ছেলেটির ছোট ভাই। সে নাশতা নিয়ে আসার পর ছেলেটির বাবা বললেন, ‘এ হচ্ছে আমার ছোট ছেলে। ডিগ্রীতে পড়ছে। আমার কোনো মেয়ে নেই।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘নাশতা নিন সবাই।’
টেবিলের এক পাশে রাখা ফলের প্যাকেটের দিকে দেখিয়ে নীলার বাবা ছেলের বাবাকে বললেন, ‘এগুলো ভেতরে নিয়ে যেতে বলুন।’
‘কেন আবার এগুলো আনতে গেলেন?’
‘তেমন কিছুই তো আনিনি।’
ফলগুলো ছেলের ছোট ভাই ভেতরে নিয়ে গেলো।
ছেলের বাবা নীলার বাবাকে বললেন,‘আপনিই কথা শুরু করুন।’
‘না, আপনারা বলুন। আমি কী বলবো!’ নীলার বাবা বললেন।
ছেলের বাবা তাঁর ভায়রার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি যা বলার বলুন।’
‘আপনারা তো আমাদের বাড়িঘর দেখেছেন। কেমন লেগেছে?’
‘ভালো।’ নীলার বাবা বললেন।
‘আমাদের কোনো বিষয়ে কোনো আপত্তি থাকলে বলুন।’
‘কোনো আপত্তি নেই।’ কথাটি বলে সামনে উপবিষ্ট ছেলেটির দিকে তাকিয়ে নীলার বাবা বললেন, ‘তোমার নামও তো এখনও জানা হয়নি।’
ছেলেটি বললো, ‘জাহিদুল হাসান লিটন।’
‘পড়ালেখা কতটুকু করেছো?’
‘ইন্টার পাশ করেছি।’ লিটন বললো।
লিটনের কথা শেষ হতেই লিটনের খালু বললেন, ‘লিটন ইন্টার পাশ করেই একটি ভালো ভিসা পাওয়ায় বছর তিনেক আগে সৌদি চলে যায়। কিন্তু যে কাজের ভিসায় গেছে, তাকে সে কাজ না দিয়ে দেয়া হয়েছে অন্য কাজ। তাই সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে সেখানে অবৈধ হয়ে যায়। পালিয়ে পালিয়ে কাজ করে। ভালোই ইনকাম ছিল। যে টাকা ঋণ করে বিদেশ গেছে, সে টাকা পরিশোধ করে দু’বছরের মধ্যেই। কিন্তু তিন বছরের মাথায় সে ধরা খেয়ে দেশে ফিরে আসে। ভাবছে এবার কাতার যাবে। ভাষাও সৌদির মতোই। তেমন সমস্যা হবে না।’
‘কাতারের ভালো কোনো ভিসা পেয়েছে?’ নীলার বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
‘কাতারের একটি ভিসা আছে একজনের কাছে। চার লাখ টাকার মতো চায়।’ কিছুক্ষণ থেমে লিটনের খালু আবার বললেন, ‘কিন্তু আমাদের কাছে আছে মাত্র এক লাখ টাকা। তাই আমরা ভেবেছি ওকে বিয়ে করাবো।’ এই কথা বলে একটু থামলেন লোকটি। থেমে নীলার বাবার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
‘বুঝলাম না।’ কিছুক্ষণ ভেবে নীলার বাবা বললেন।
‘আমরা ভাবছি বিয়ে করিয়ে ওর শ^শুরদের কাছ থেকে, ধার হোক বা এমনি হোক, কিছু টাকা নিয়ে ওকে কাতার পাঠাবো।’ লিটনের বাবা বললেন।
কেউ কিছু না বলে অনেকক্ষণ থেমে রইলেন।
শেষে লিটনের খালুই মুখ খুললেন। বললেন, ‘লিটনের জন্য এর আগেও আমরা কয়েকটা মেয়ে দেখেছি। মেয়েগুলো বেশ পছন্দের হলেও সবাই গরীব ঘরের মেয়ে। এতো টাকা দিতে পারবে না। তাই আমরাও ওদের অবস্থা দেখে টাকার কথা না বলে পিছপা হয়ে গেছি। নয়তো সবাই আমাদেরকে পছন্দ করেছে।’
নীলার মামা এবার বললেন, ‘কত টাকা দিতে হবে?’
‘লাখ তিনেক টাকা দিলেই হবে। সব মিলিয়ে চার লাখ টাকার মতো লাগবে। আপনারা পারবেন আশা করি। আপনাদের মেয়ে এখানে বেশ সুখেই থাকবে। বিয়ের সময় আমরা আপনাদেরকে আর বেশি কোনো চাপ দেবো না। আমাদের ত্রিশ-চল্লিশজন মানুষ খাওয়ালেই চলবে। আপনারাও পনেরো বিশজন আসবেন আমাদের বাড়িতে।’ লিটনের খালু বললেন।
নীলার বাবার কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা দিলো। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, ‘আমরা আপনাদেরকে দু’চারদিনের মধ্যেই জানাবো। এখন তাহলে আসি।’
লিটনের ছোটভাই ফল নিয়ে এলো প্লেটে করে। সাথে চা-ও নিয়ে এলো।
লিটনের বাবা বললেন, ‘না না, চা খেয়ে যান।’
‘এখন আর চা খাবো না।’ বলে নীলার খালু নীলার বাবার হাত ধরে বেরিয়ে এলেন।
২১.
‘কী করবো। জায়গা-জমি থাকলেও কিছু বিক্রি করে নীলাকে এখানে বিয়ে দিতাম। এর চেয়ে ভালো পাত্র কি আর পাওয়া যাবে। আর অনেকে তো নীলাকে পছন্দই করছে না। ডিপিএসটা করেছি ওর বিয়ের জন্যই। কিন্তু ওরা যা চাচ্ছে, ডিপিএসটা ভাঙলেও সেটা হবে না। এখন কী হবে!’ নীলার বাবা রাতে নিজেদের কক্ষে বসে নীলার মা’কে কথাগুলো বলছিলেন।
‘চিন্তা করো না। দেখো বাকি টাকা কোনো দিক থেকে ম্যানেজ করা যায় কিনা! মেয়েকে তো বিয়ে দিতে হবে। ওর বিয়ের বয়স হয়েছে আরো আগেই। ওর সাথের অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে আরো আগে। আমরা না হয় কয়েকটা বছর কষ্ট করলাম। দেখো, বাকি টাকা কোথাও থেকে লোন নিতে পারো কিনা!’ নীলার মা বললেন।
নীলা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ওর বিয়ে নিয়ে ওর বাবা-মায়ের কথাবার্তা শুনতে লাগলো। ওর কান্না এসে গেলো ওদের কথা শুনে। শেষে বাবা-মায়ের কাছে এসে কান্নাজড়িত কন্ঠে বললো, ‘তাহলে তোমরা আমার যৌতুকের জন্য আমার নামে ডিপিএস খুলেছিলে? আমাকে বললে কী হতো! আমি এখন না, কখনোই বিয়ে করবো না। আমি পড়ালেখা করে চাকরি করবো। তোমরা আমাকে শুধু পড়ালেখা করাও। আমার জীবন আমিই চালাতে পারবো। আমার জন্য যে ডিপিএসটা করেছো, সে ডিপিএসের টাকা রেজার উচ্চশিক্ষার জন্য খরচে করো।’ এই বলে নীলা ওর কক্ষের দিকে চলে গেলো। রেজা নীলাকে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপু, কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন?’
‘আমাদের বাড়িতে বিয়ের কোনো অনুষ্ঠান হবে না, রেজা। শুধু তোর আনন্দের জন্য সেদিন ছেলেপক্ষ আমাকে দেখতে আসায় আমি বিয়েতে রাজি হয়েছি। কিন্তু ওরা আমাদের কাছে তিন লাখ টাকা যৌতুক চাইছে।’
‘যৌতুক কী, আপু?’
‘আমাদের দেশে যেসব মেয়ের বিয়ে হয় না, তাদের বিয়ে দিতে চাইলে বরপক্ষকে টাকা দিতে হয়। এটাই যৌতুক।’
‘কেন, টাকা দিয়ে ওরা কী করবে? ওদের টাকা পয়সার অভাব থাকলে ওরা চাকরি করুক। ব্যবসা করুক। আমাদের কাছে টাকা চাইবে কেন?’
‘রেজা, দুঃখ করিস না। আমার বিয়ে না হলেও একদিন আমরা আমাদের বাড়িতে বিয়ের আয়োজন করবোই। অনেক মজা করবো।’ কাঁদতে কাঁদতে বললো নীলা।
‘কার বিয়ের আয়োজন?’
‘এখন আর কিছু জিজ্ঞেস করিস না। আমার ভালো লাগছে না। ঘুমাতে যা।’
রেজাকে ঘুমাতে যেতে বলে নীলা জেরিনকে ফোন করলো। ফোন করে ছেলেদের বাড়িতে ওর বাবা যাবার পর যা ঘটলো, সব বললো।
২২.
পরদিন কলেজে যাবার পথে কলেজের গেটের একপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জেরিন আগেরদিন ঘটে যাওয়া নীলার ঘটনাটি বলতে থাকে নাবিল এবং সাগরের কাছে। সব শুনার পর সাগর বললো, ‘ছেলেটির বাবার ফোন নাম্বার জোগাড় করা যাবে?’
‘কী জন্য?’ জেরিন বললো।
‘আমি তাঁকে শুধু জিজ্ঞেস করবো, মানুষ কেন বিয়ে করে? টাকার জন্য?’
‘দরকার নেই। যখন বিয়েটা হচ্ছেই না, তখন আর বাড়তি ঝামেলা করে লাভ নেই। দেশে এখনো একটা শ্রেণি যৌতুকের উদ্দেশ্যেই বিয়ে করে। কিছুই করার নেই।’ নাবিল বললো।
নীলাকে আসতে দেখে সাগর বললো, ‘চল, নীলা আসছে। ও মনে করতে পারে হয়তো আমরা ওকে নিয়েই আলোচনা করছি।’
২৩.
[এই ঘটনার পর চার বছর পার হয়ে গেলো। নীলা বিয়ের জন্য কোনোভাবেই রাজি হলো না। নীলার অনার্সও কমপ্লিট হলো একই কলেজ থেকে। নাবিল ও সাগর ইন্টার পাশের পর জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হলো। জেরিনের বিয়ে হয়ে গেলো আরিফের সাথে। তবে বিয়ে হওয়ার পরও সে নীলার সাথে একই কলেজে অনার্স করলো। নীলার ছোট ভাইটিও ঢাকার একটি ভালো কলেজে ইন্টারে ভর্তি হলো। অনার্স ফলাফল প্রকাশের পর নীলা চাকরি খুঁজতে শুরু করলো। একদিন একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পনীতে নীলা ইন্টারভিউ দিতে গেলো।]
নীলা ওয়েটিং রুমে বসেছিলো। তার সাথে ছিল আরো কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী। এসময় নীলার ফোন বেজে উঠলো। নীলার মামার ফোন ছিলো। নীলার মামা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিরে, কী অবস্থা?’
‘ওয়েটিং রুমে বসে আছি। ভয়ে বুক কাঁপছে।’
‘টেনশন করিস না। টেনশন করলে ইন্টারভিউ খারাপ হবে। তোর সিরিয়াল নাম্বার কত?’
‘আমার আগে ২৩ জন গেছে। আমার সাইন নিয়েছে ২৬ নাম্বার সিরিয়ালে। মামা, দোয়া করো, যেন ভালো হয়।’
ভাইভা বোর্ডে নীলার আগের এক ছেলে প্রার্থীর ইন্টারভিউ নেয়া হচ্ছে। ভাইভা বোর্ডে চার-পাঁচজন লোক ছিলো। আগে অনেকগুলো প্রশ্ন করার পর একজন ওকে প্রশ্ন করলেন, ‘ইংরেজি করুন: ‘‘আমি তোমাকে খাওয়াবো’’।’
ঐ প্রার্থী বেশি দেরি না করে উত্তর দিলো, ‘আই শ্যাল ইট ইউ’।’
‘ভাইভা বোর্ডের আরেকজন রসিকতা করে বললেন, ‘‘ইট’’ অর্থ হচ্ছে ‘‘খাওয়া’’, তাহলে আপনার কথার অর্থ দাঁড়ায় ‘‘আমি তোমাকে খাবো’’। কী বললেন এটা?’
ঐ প্রার্থী বললো, ‘আমার ভুল হয়েছে স্যার, স্যরি।’
‘আপনি আসতে পারেন। ... নেক্সট।’
আরেকজন ছেলেপ্রার্থী প্রবেশ করলো ভাইভা বোর্ডে।
তাকে কিছু প্রশ্ন করার পর ভাইভা বোর্ডের একজন তাকে একপর্যায়ে প্রশ্ন করলেন, ‘ইউ আর টেন ইয়ার্স ওল্ড’ এই বাক্যটির ‘‘টেন’’ এর নীচে যদি দাগ দেয়া হয়, তাহলে ডব্লিউ-এইচ কোশ্চেন কী হবে?’
ঐ প্রার্থী তেমন কিছু না ভেবে উত্তর দিলো, ‘এটা তো বেশ সহজ। এটার ডব্লিউ-এইচ কোশ্চেন হবে ‘‘হাও ওল্ড আর ইউ?’’
প্রশ্নকর্তা বললেন, ‘তাহলে ‘‘আই এম টেন ইয়ার্স ওল্ড’’ এর ডব্লিউ-এইচ কোশ্চেন কী হবে?’
ঐ প্রার্থী নিজের ভুল বুঝতে পেরে চুপ করে রইলো।
প্রশ্নকর্তা বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি আসতে পারেন। ... নেক্সট।’
এবার প্রবেশ করলো নীলা।
নীলাকে যা যা জিজ্ঞেস করা হলো, নীলা বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলো। শেষে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইংরেজি করুন: ‘‘আমি তোমাকে খাওয়াবো’’।’
নীলা একটু ভেবেই উত্তর দিলো, ‘আই শ্যাল ফীড ইউ’।’
প্রশ্নকর্তা খুশি হয়ে গেলেন।
এরপর আরেকজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইউ আর টেন ইয়ার্স ওল্ড’ এই বাক্যটির ‘‘টেন’’ এর নীচে যদি দাগ দেয়া হয়, তাহলে ডব্লিউ-এইচ কোশ্চেন কী হবে?’
নীলা বিনয়ের সাথে বললো, ‘স্যার, বাক্যটি আবার বলুন।’
প্রশ্নকর্তা বাক্যটি পুণরায় বলার পর নীলা উত্তর দিলো, ‘হাও ওল্ড অ্যাম আই’।’
নীলার এই প্রশ্নের উত্তরে ভাইভা বোর্ডেল সবাই বেশ খুশি হলেন।
এবার ভাইভা বোর্ডের প্রধান নীলাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলুন তো, শূন্যের কি কোনো দাম আছে?’
‘স্যার, শূন্যের দাম কখনো আছে, কখনো নেই।’
প্রশ্নকর্তা অবাক হবার ভান করে বললেন, ‘মানে?’
নীলা বললো, ‘স্যার, শূন্য যখন সংখ্যার আগে আসে বা একা আসে, তখন শূন্যের কোনো দাম থাকে না। কিন্তু যদি কোনো সংখ্যার মাঝখানে বা শেষে আসে তখন দাম আছে। আবার দশমিক ভগ্নাংশে শূন্য যখন দশমিকের পরে আসে, তখন শূন্যেরও কোনো দাম নেই, দশমিকেরও দাম নেই।...’
ভাইভা বোর্ডের প্রধান নীলাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে। আর বলতে হবে না। শুনুন, আপনার পারফর্মেন্স দারুণ। কিন্তু আপনাকে আমরা চাকরি দিতে পারছি না। কারণ আমাদের প্রতিষ্ঠানে দরকার স্মার্ট কর্মী।’
নীলা সামান্য ভেবে বললো, ‘কিন্তু বিজ্ঞপ্তিতে তো এরকম কোনো শর্ত উল্লেখ করা হয়নি!’
‘সব কিছু বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা যায় না।’
‘কালো মেয়ে কি স্মার্ট হতে পারে না? শুধু কালো বলেই কি মানুষ আনস্মার্ট?’
‘আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা বাধ্য নই।’
‘ঠিক আছে, আমাকে কালো দেখেও কেন তাহলে আমার ইন্টারভিউ নিতে গেলেন? প্রথমেই বলে দিতে পারতেন, আপনার চাকরি হবে না। চলে যান।’
‘ভেবেছি আপনাকে প্রশ্ন করেই আটকে দেবো। কিন্তু...’ পাশ থেকে একজন বললেন।
‘আপনি আসতে পারেন।... নেক্সট।’ বলে নীলাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলেন না ভাইভা বোর্ডের প্রধান।
নীলা বাড়ি এসে কান্নাকাটি করতে লাগলো। ওর মা বললেন, ‘কী হয়েছে নীলা? কোনো বিপদ?’
‘না, মা। শুধু কালো বলেই আজ আমার চাকরি হয়নি।’
‘দুঃখ করিস না। মানুষ সব সময় সব দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ হয় না। তোর ভাগ্যে হয়তো আরো বড় কিছু আছে।’
‘মা, আমার ভাগ্যের প্রতি আমার আর কোনো আস্থা নেই।’
এরই মধ্যে নীলার ফোন বেজে উঠলো। জেরিন কথা বলতে লাগলো, ‘নীলা, প্রাইমারী স্কুলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এপ্লাই করবি?’
‘না রে, আমার কোথাও চাকরি হবে না।’
‘কেন এমন বলছিস? আর হ্যাঁ, আজ-কালের মধ্যে তোর একটা ইন্টারভিউ হবার কথা ছিল, সেদিন ফোনে বললি। ওটার কী হলো?’
‘ইন্টারভিউ ভালোই হলো। কিন্তু ওরা শেষে বললো, আমাদের স্মার্ট কর্মী দরকার।’
‘বাদ দে এসব। কোম্পানীর চাকরি এমনই। পরিশ্রমও বেশি। প্রাইমারীর চাকরিতে এরকম কোনো সমস্যা নেই। আমি যে প্রাইমারী স্কুলে পড়েছি, সেখানেও একজন ম্যাডাম চাকরি করতেন, যিনি কালো ছিলেন। ভাগ্য ভালো হলে তোরও চাকরি হয়ে যেতে পারে। কোনো কথা নেই। আমি এপ্লাই করবো। তুইও করিস।’
২৪.
‘মা, এ পর্যন্ত কতো জায়গায় পরীক্ষা দিলাম, কোথাও চাকরি হলো না। প্রাইমারীতেও ভাইভা পর্যন্ত দিলাম। এখনো কোনো খরব নেই। কী করবো! আর কত জায়গায় ইন্টারভিউ দেবো! মাঝে মাঝে মনে চায়, গার্মেন্টসে গিয়ে কাজ করি।’ খুব মন খারাপ করে নীলা বললো ওর মা’কে।
‘এমন কথা বলছিস কেন? গার্মেন্টসে কারা চাকরি করে, তুই জানিস? তুই কি আমাদের বোঝা হয়ে গেছিস? তোকে কি আমরা অবহেলা করছি? ধৈর্য্য ধর। সুদিন আসবেই।’
নীলার মা কথাটি শেষ করতে না করতেই নীলার ফোন বেজে উঠলো। নীলা ইশারায় ওর মাকে একটু চুপ থাকতে বলে ফোন রিসিভ করলো। অন্য প্রান্ত থেকে জেরিন জিজ্ঞেস করলো, ‘নীলা, আজ প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে। আমার হাজবেন্ড নেটে দেখেছে, আমার রোল নং নেই। তোর ফলাফল কী?’
‘ফলাফল প্রকাশের কথাই আমি জানি না। তোর কাছেই এখন শুনলাম।’
‘তোর রোল নং টা দে। ফোনে আমার হাজবেন্ডকে দেবো। তোর ফলাফল দেখে সে আমাকে জানালে আমি তোকে ফোন করে জানাবো।’
‘আমি মুখস্থই পারি। তোকে বলছি। লিখে নে।’
নীলা জেরিনকে ওর রোল নং বলে দিলো। কিছুক্ষণ পর আবার নীলার ফোন বেজে উঠলো। জেরিন বললো, ‘নীলা, তোর চাকরি হয়ে গেছে। তুই খুব ভাগ্যবান। আমার ভাইভাটাও মোটামুটি ভালোই হলো। কিন্তু আমার চাকরি হলো না।’
নীলা ফোন রেখে দিয়ে ওর মাকে বললো, ‘মা, প্রাইমারি স্কুলে আমার চাকরি হয়েছে।’
‘সত্যি?’
‘জেরিন ওর হাজবেন্ডের মাধ্যমে জেনে নিয়ে এইমাত্র আমাকে ফোনে বলেছে। মা, আমার কিছুতেই বিশ^াস হচ্ছে না।’
‘আগে তোর বাবাকে জানিয়ে দে। এরপর তোর মামা সহ আমাদের সব আত্মীয়কে জানিয়ে দিস।’
‘ঠিক আছে।’ বলে নীলা ওর ফোন হাতে নিলো।
২৫.
রাতে ওর বাবা বাড়ি আসার পর খেতে বসে নীলাকে বললেন, ‘তুই তোর মামাকে ফোনে তোর চাকরির কথা জানানোর পর তোর মামা আমাকে ফোন করে বললেন, ‘এবার নীলার জন্য ভালো ভালো জায়গা থেকে প্রস্তাব আসবে।’
‘এতোদিন যখন বিয়ে করিনি, এখন তো আর কোনোভাবেই করবো না।’
‘কী সব উল্টাপাল্টা কথা বলছিস! যেসব মেয়ের বিয়ে হয় না, তাদের কোথাও চাকরি হলে, তাদের বিয়ে হতে তেমন দেরি হয় না। তুই এটা বুঝিস না?’
‘বুঝি বলেই আমি এখন কোনোভাবেই বিয়ে করবো না। আগে মানুষ দেখতো আমরা ওদেরকে কত টাকা যৌতুক দিতে পারবো। আর এখন আমার চেয়ে আমার চাকরিকে মানুষ গুরুত্ব দেবে বেশি। আমার দাম তাহলে কোথায়! আমাকে তো কেউ দাম দিচ্ছে না।’
‘তোকে আর বুঝাবো না। এবার তোর মর্জির উপর ছেড়ে দিলাম।’
২৬.
একদিন বিকেলে নীলা স্কুল থেকে ফেরার পথে বাড়ির কাছাকাছি আসতেই ওর ফোন বেজে উঠলো। ও প্রান্ত থেকে জেরিন বললো, ‘কিরে নীলা, তুই এখন কোথায়? তোর সাথে একটু কথা আছে। এখন বলা যাবে?’
‘স্কুল থেকে ফিরছি। বাড়ির কাছাকাছি। ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে তোকে ফোন করবো।’
‘এবার বল, কী জন্যে ওই সময় ফোন করেছিস? তোর কি কোনো নতুন খবর আছে?’
‘‘নতুন খবর’ মানে?’
‘মানে আর কী! বিয়ের পর ঘরে নতুন মেহমান আসে না? সেই খবর।’ একটু হেসে নীলা বললো।
‘না, নতুন খবর আমার নয়, নতুন খবর তোর।’
‘বিয়ে না হতেই আমার কিসের নতুন খবর! কী সব উল্টাপাল্টা বলছিস! পাগল হয়ে গেলি নাকি!’
‘সত্যিই নতুন খবর। তবে যে রকম ভাবছিস, সেরকম নয়। লম্বা কথা। তোর হাতে সময় আছে?’
‘আছে। বল।’
‘ইন্টার পাশ করার পর নাবিল এবং সাগর উভয়ে ঢাকায় চলে যায়, তুই জানিস। এটাও জানিস, ওদের সাথে আমার প্রায়ই ফোনে কথা হয়। তোকে কখনো ওদের সম্পর্কে কিছু বলতাম না। কারণ তোর ভালো লাগতো না। আগে বলি নাবিলের কথা। নাবিল আমাকে প্রায়ই বলতো, সে তোকে বিয়ে করার চেষ্টা করবে, যদি সে প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত তোর বিয়ে না হয়। কিন্তু অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় ওর ভাইয়া হঠাৎ একদিন হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। ওর ভাইয়া ঢাকায় ব্যবসা করতো। একটা ছেলে ছিল তিন বছর বয়সী। ওর ভাইয়ার মৃত্যুর পর ওর ভাবিকে তার বাবার বাড়ির সবাই তার বাবার বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলো। তাদের ইচ্ছা ছিল তাদের মেয়ের বয়স এখনো কম। ওকে অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দেবে। কিন্তু নাবিলের ভাবি তার বাবার বাড়ি যেতে চাইলো না। সে বললো, আমি এমন ভালো স্বামী আর পাবো না। আমি আমার এই ছেলেকে নিয়েই জীবন কাটাবো। নাবিলের বাবা-মা না পারছিলো ওর ভাবিকে থাকতে বলতে, না পারছিলো যেতে দিতে। কারণ যেতে দিলে তিন বছরের এই ছেলেকে কিভাবে লালন পালন করবে! আর নাতিকে ওর মায়ের সাথে যেতে দিতেও ওরা চাইছিলো না। এই সঙ্কট যখন মারাত্মক হয়ে গেলো, তখন হঠাৎ একদিন নাবিলের এক বোন আছে, সে প্রস্তাব দিলো, যদি নাবিল ওর ভাবিকে বিয়ে করে, তাহলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। নাবিলের ভাইয়ার ব্যবসাটাও সে চালাতে পারবে। শেষে নাবিলকে এই প্রস্তাব দেয়ার পর এবং অনেক বুঝানোর পর নাবিল অনেক চিন্তা-ভাবনা শেষে রাজি হয়। কারণ ওর ভাবি তার বাবার বাড়ি যেতে চাইছিল না। নাবিল ভাবলো, ‘এভাবে অল্পবয়সী একজন মহিলা কিভাবে স্বামী ছাড়া একটা জীবন কাটাবে! তাই নাবিল মানবিক দিক লক্ষ্য করে ওর ভাবিকে বিয়ে করলো। এখন সে তার ভাইয়ার ব্যবসা চালাচ্ছে আর ব্যবসার ফাঁকে পড়াশুনাও চালিয়ে যাচ্ছে।’ লম্বা কথা বলার পর একটু থামলো জেরিন।
নীলা বললো, ‘তোর সাথে আমার মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়। আমাকে আগে কখনো বলিসনি কেন?’
‘বলে কী লাভ হতো! নাবিল তো তোকে বিয়ে করার সুযোগই শেষ হয়ে গেলো। তোরও হয়তো খারাপ লাগতো। কারণ নাবিল তোকে পছন্দ করতো, তুইও এটা জানতি।’
‘তাহলে এখন কেন বলতে গেলি?’
‘এটা ছিল ভূমিকা। কথাগুলো এখন বলতে যাওয়ার মূল কারণ হলো সাগর।’
সাগরের নাম বলতেই নীলার মনে ভেসে উঠলো তাকে দেয়া সাগরের প্যাকেটটির কথা। সাথে ছোট্ট চিরকুটের কথা। তাতে লেখা ছিলো, ‘সরি, সরি এবং সরি। সম্ভব হলে আমাকে মাফ করবেন। আমি যে অন্যায় করেছি, সেজন্য শুধু মাফ চাওয়াকেই আমি যথেষ্ট মনে করছি না। পারলে আপনাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিতাম। আপনি রাজি হোন, কি না হোন, সেটা পরের কথা। কিন্তু তা সম্ভব নয়। কারণ আমার এখনো কোনো ইনকাম সোর্স নেই। তবু আপনার বিয়ের আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করবো।
আরেকটি কথা। এই পারফিউমটি আপনার জন্য উপহার। এটি আমার বড় ভাইয়া আমার জন্য পাঠিয়েছেন আমেরিকা থেকে। সাগর।’
জেরিন বললো, ‘কথা কলছিস না যে! শুনতে পাচ্ছিস?’
‘হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি। বল।’
‘সাগরের ঘটনা আরো আগের। তোকে আমি আগেও একদিন বলেছি, সাগরও নাবিলের মতো তোকে ভালোবাসে। ঢাকা চলে যাবার পর সাগর যখন অনার্স থার্ড ইয়ারে উঠেছে মাত্র, তখন ওরা সপরিবারে আমেরিকা চলে যায়। ওর বড় ভাইয়া আমেরিকা থাকতো।’
জেরিন এ পর্যন্ত বলার পর নীলার মনে পড়ে যায় ওকে দেয়া সাগরের গিফটের কথা। সাগর চিঠিতে লিখেছিল, ‘এই পারফিউমটি আপনার জন্য উপহার। এটি আমার বড় ভাইয়া আমার জন্য পাঠিয়েছেন আমেরিকা থেকে।’
‘আমার কথা শুনছিস?’ জেরিন বললো।
‘হ্যাঁ, শুনছি। বল।’
‘সাগর প্রায়ই আমার সাথে ম্যাসেঞ্জারে কথা বলতো। ও বেশির ভাগ সময় তোর সম্পর্কে জানার জন্যই ফোন করতো। গতকাল সে ফোন করে জানিয়েছে, ওর নাকি গ্রীন কার্ড হয়ে গেছে। ওখানে তার একটা চাকরিও হয়েছে পার্টটাইম। সাথে পড়াশুনা তো চলছেই। সামনের মাসে সে দেশে আসবে। এসেই বিয়ে করবে।’
এ পর্যন্ত বলে জেরিন একটু থামলো।
‘থেমে গেলি কেন?’
‘না, দেখছি, তোর কৌতুহল কেমন?’
‘আমার কৌতুহল দিয়ে কী হবে? ওর জন্য পাত্রী ঠিক হয়েছে?’
‘সাগর আমাকে গতকাল ফোন করেছে শুধু তোর বিয়ে হয়েছে কিনা, তা জানার জন্য।’
‘কেন?’
‘আমি যখন বলেছি, ওর এখনও বিয়ে হয়নি, তবে প্রাইমারী স্কুলে ওর চাকরি হবার পর থেকে প্রায় প্রতিদিন ওকে কোনো না কোনো জায়গা থেকে দেখতে আসছে। কিন্তু ও রাজি হচ্ছে না। এ কথা শুনে সাগর অস্থির হয়ে গেলো। সে বললো, আমি প্রস্তাব দিলেও কি রাজি হবে না? আমি বললাম, সেটা নীলাকে জিজ্ঞেস করা ছাড়া কিভাবে বলি! এরপর সাগর আমাকে অনুরোধ করে বললো, তোকে তার পক্ষ হয়ে একবার এই কথাটা জিজ্ঞেস করতে।’
‘জেরিন, আমি কোথাও কেন রাজি হচ্ছি না, তুই জানিস। কিন্তু সাগরের প্রস্তাবে আমার দ্বিমত নেই। তুই ওকে বলে দিতে পারিস।’
‘আচ্ছা তাহলে রাখ, ওকে এখনই কল দিচ্ছি।’
কিছুক্ষণ পর জেরিন ফোন করে নীলাকে বললো, ‘তুই রাজি হবার কথা জেনে খুশিতে সাগরের কথাই বন্ধ হয়ে গেছে কিছুক্ষণের জন্য। শেষে আমাকে বললো, ‘তোকে নিয়ে নাকি ওর একটা বিশেষ পরিকল্পনা আছে। ও সামনের মাসের ৮ তারিখে দেশে আসছে। এসেই তোকে নিয়ে এক জায়গায় যাবে।’
২৭.
নীলাদের বাসায় ওর বাবা-মা, জেরিন, নীলার মামা সবাই বসে আছেন। শুধু নীলা নেই। নীলার বাবা বললেন, ‘জানি না, কিভাবে সাগরের সাথে বিয়ের জন্য নীলা রাজি হয়েছে। এতোদিন এতো দিক থেকে প্রস্তাব এলো, কোথাও রাজি হয়নি।’
‘ভাগ্য ভালো। শেষে রাজি হয়েছে। এখন আর এগুলো নিয়ে ভেবে লাভ নেই।’ একটু থেমে নীলার মামা আবার বললেন, ‘আচ্ছা, ওরা গেলো কোথায়? সকালে গেছে। বিকেল হয়ে গেলো। এখনো আসছে না কেন? কোথায় গেছে, আপনাদেরকে কিছুই বলেনি?’
এসময় দরজায় শব্দ হলো।
দরজা খুলে দিলেন নীলার মা। বাইরে তাকিয়ে অবাক হয়ে যান।
নীলার বাবা বললেন, ‘কী হয়েছে? দাঁড়িয়ে আছো কেন? কে এসেছে? নীলা? ভেতরে আসছে না কেন?’
‘দেখো, দেখো, সাগরের সাথে এ কোন মেয়ে? আমাদের নীলা এখন আর নীলা নেই!’
নীলা এবং সাগর ভেতরে আসার পর সবাই নীলাকে দেখে অবাক হয়ে গেলো। নীলার গায়ের রং পাল্টে গেছে।
ভেতরে আসার পর সাগর বললো, ‘যুগ যুগ ধরে সারা বিশে^ই মানুষ ত্বক ফর্সা করার অনেক ক্রীম ব্যবহার করে আসছে। আগের চেয়ে ফর্সা হোক বা না হোক, ত্বকের তো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। এখন পার্লারের যুগ। অনেক কালো মেয়েকে দেখে হঠাৎ চেনাই যায় না। পরে মনে হয়, মেয়েটি নিশ্চয়ই পার্লার থেকে ঘুরে এসেছে। ক্ষতি তো হচ্ছে না। কিছু পয়সা হয়তো খরচ হচ্ছে। আমি নীলাকে পার্লারে নিয়েছি ওকে আমার কাছে দেখতে সুন্দর লাগবে, এজন্যে নয়। কারণ আমি একটি প্রবাদ পড়েছি এরকম, ‘বাতি নিভিয়ে দিলে কালো-সাদা সবই সমান।’
একটু থেমে সাগর আবার বলতে শুরু করলো, ‘এক সময় কালো মেয়েদের প্রতি আমার একটা অনীহা ছিল। কিন্তু কলেজে থাকতে আমার এক বন্ধু ছিল নাবিল। ওর সাথে থেকে আমার এই অনীহা অনেকটা কেটে গেলো। শেষে আমেরিকা যাবার পর বাকিটাও কেটে গেলো। দেখেছি, সেখানে কালো-সাদার তফাৎ এখন আর তেমন কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় না। বরং অনেক ফর্সা মেয়ে রোদে পুড়ে কালো হয়ে যেতে চায়। নীলাকে পার্লারে নিয়েছি শুধু এই উদ্দেশ্যে, কালো হওয়াতে ওর মনে সবসময় একটা হীনমন্যতা কাজ করতো, তা দূর করার জন্য। আমি কি অন্যায় কিছু করেছি?’
কেউ কিছু বললো না। সবাইকে এতে সন্তুষ্ট বুঝা গেলো।
শেষে নীলার বাবা বললেন, ‘আমি প্রায়ই নীলকে বলতাম, নীলা, মন খারাপ করিস না। সব মানুষ জীবনে সব কিছু পায় না। একটা বিষয় হয়তো তোর মনমতো পাসনি। তাই বলে অন্য সব বিষয়ও যে তোর বিপক্ষে যাবে, তা না ভেবে অপেক্ষা কর। দেখবি, সময় কথা বলবে।’
‘তাহলে আমার বাবা-মাকে নীলার সাথে বিয়ের কথা জানাতে পারি? জানলেই ওরা দেরি না করে দেশে চলে আসবে। আমি আসার সময় সামান্য ইঙ্গিত দিয়েই বুঝেছি।’
‘নীলাকেই ওর বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করো। সে এতোদিন কোনোভাবে বিয়ের জন্য রাজি হচ্ছিল না।’ নীলার মামা বললেন।
নীলার মামার কথা শুনে নীলা সামান্য মুচকি হেসে নিজের রুমের দিকে চলে গেলো। এমন হাসি হয়তো নীলা ওর জীবনে খুব কমই হাসার সুযোগ পেয়েছে। নীলার হাসি দেখে সাগরের মুখেও হাসির রেখা দেখা দিলো।
কোনো এক মফস্বল শহরের এক কলেজ থেকে ফিরছিলো একদল ছাত্রী। সবাই হাসিখুশি, উচ্ছল। ওদের পেছন পেছন আসছিলো আরো একটি মেয়ে। একা একা। কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর মেয়েদের দল থেকে একটি মেয়ে থেমে অপেক্ষা করতে লাগলো পেছনের মেয়েটি আসার। পেছনের মেয়েটি নিকটে আসতেই ঐ মেয়েটি বললো, ‘কিরে নীলা, তুই সব সময় সবার থেকে আলাদা থাকিস কেন? আমরা একই ক্লাসে পড়ি, চলাফেরাও করবো একসাথে। সমস্যা কোথায়!’
নীলা কিছুক্ষণ নীরব থাকলো।
পরে বললো, ‘তুই ছেলে হলে আমার সমস্যাটা সহজে বুঝতে পারতি।’
‘সরি, বুঝলাম। কিন্তু এটা নিয়ে এতো সিরিয়াস হবার কী আছে?’
‘জেরিন, আমি মাঝে মাঝে ভাবি, পৃথিবীতে সব মানুষের গায়ের রং একই রকম হলে কি কোনো অসুবিধা হতো?’
‘হয়তো হতো। কিন্তু তোকে এসব নিয়ে আর ভাবতে হবে না। তুই সব সময় আমাদের সাথে একত্রে চলাফেরা করবি।’ এই বলে জেরিন নীলার হাত চেপে ধরে নিয়ে আসতে লাগলো দলের দিকে।
নীলা বললো, ‘জোর করিস না জেরিন। আমার একাকী চলতেই বেশি ভালো লাগে।’
‘সবার সাথে একত্রে চলতে তোর খারাপ লাগলে শুধু আমার সাথে চলতেও কি তোর খারাপ লাগবে?’
নীলা কিছু না বলে তাকিয়ে থাকলো জেরিনের দিকে।
২.
রাতে খেতে বসে নীলার মা নীলাকে ডাক দিলেন, ‘নীলা, খেতে আয়। খেয়ে-দেয়ে আবার পড়তে পারবি। আমরা খেতে বসেছি।’
নীলা বললো, ‘আর একটু কাজ আছে। শেষ করে আসছি।’
নীলার মা এবার নীলার বাবাকে বললেন, ‘তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল।’
‘বলো।’
‘নীলার জন্য যে ডিপিএসটা খুলেছো, সেখানে কত টাকা জমা হয়েছে?’
‘৯০ হাজারের মতো হবে।’
‘মেয়াদ পূর্ণ হবে কবে?’
‘সামনের বছরের ডিসেম্বরে। দেড় লাখ টাকার মতো পাওয়া যাবে।’
নীলার সপ্তম শ্রেণিতে পড়–য়া ছোট ভাই রেজা বলে উঠলো, ‘বাবা, তুমি নীলার জন্য ডিপিএস খুলেছো। আমার জন্য খোলোনি কেন?’
‘তোমার জন্য লাগবে না, এজন্য।’
‘তাহলে নীলার জন্য খুলেছো কেন?’
‘তুমি এখন বুঝবে না।’
রেজা আর কিছু বললো না।
নীলা পড়ার টেবিল থেকে উঠে আসার সময় শুনতে পেলো, ওর বাবা রেজাকে বলছে, ‘তুমি এখন বুঝবে না’। এই কথার পর রেজা যখন চুপ মেরে যায়, তখন নীলা এসে ওর বাবাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘রেজা কী বুঝবে না বাবা?’
‘তোমার এখন জেনে কাজ নেই।’ নীলার মা বললেন।
‘আপু, ব্যাংকে তোমার নামে একটা ডিপিএস করা আছে, সেটার কথাই আব্বু-আম্মু এতক্ষণ বলছিলেন। তোমার ভাগ্য খুব ভালো, আপু। আমিও যদি তোমার মতো মেয়ে হতাম, আমার নামেও আব্বু ডিপিএস খুলতেন!’
‘এতো কথা না বলে মনোযোগ দিয়ে খাবার খাও। গলায় কাঁটা আটকাবে। নিজেই একসময় বুঝবে, কেন তোমার নামে ডিপিএস না খুলে তোমার বোনের নামে খুলেছি।’ রেজার বাবা বললেন।
৩.
নীলা খাবার খেয়ে আবার গিয়ে পড়তে বসলো। কিন্তু পড়ায় ওর মন বসছিলো না। ও ভাবতে লাগলো, ‘এত অভাবের পরও কেন বাবা আমার নামে ডিপিএস খুলতে গেলেন? আমার বিয়েতে খরচের জন্য? একটা গরীব মেয়ের বিয়েতে এতো খরচ লাগবে? ... জানি না।’
ভাবনার মাঝখানে নীলার মা নীলাকে ডাক দিলেন, ‘নীলা, সামনে তোর টেস্ট পরীক্ষা। বসে থাকিস না। বসে থাকলে কি ভালো পাস আসবে? রেজাকেও মাঝে মাঝে পড়া দেখিয়ে দিস।’
৪.
পরদিন কলেজে যাচ্ছিল নীলা। নীলাদের পাশের বাড়ির একজন মুরুব্বিকে দেখে নীলা সালাম দিলো। লোকটি বললো, ‘কলেজে যাচ্ছো নাকি?’
‘জি¦, আঙ্কেল।’
‘কলেজে কিভাবে যাও?’
‘বাজার থেকে সিএনজিতে করে কলেজ মোড়ে নামি। বাকি এক কিলো পথ বেশিরভাগ সময় হেঁটে হেঁটেই কলেজে যাই।’
‘এবার কি ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার, নাকি পরীক্ষার্থী?’
‘এবার পরীক্ষার্থী।’
‘ঠিক আছে। কলেজে যাও। পরীক্ষা ভালো করে দিও।’
‘দোয়া করবেন।’
৫.
নীলা কিছুদূর যাবার পর নীলার বাবা বের হলেন বাড়ি থেকে। নীলার ঐ আঙ্কেল নীলার বাবাকে দেখে বললেন, ‘কেমন আছেন?’
‘ভালো। বাড়ি এলেন কবে?’
‘গতকাল রাতে। দু’দিনের ছুটি এনেছি।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘তোমার মেয়েকে দেখলাম কলেজে যাচ্ছে। মেয়েটির তো বিয়ের বয়স হয়েছে। বিয়ে কি আরো পরে দেবে?’
‘বিয়ের প্রস্তাবও তো আসছে না কোথাও থেকে। মাসখানেক আগে একটি প্রস্তাব এসেছিল। মেয়েকে দেখে ওরা তেমন কিছু না বলেই চলে গেছে। নাশতা দিয়েছি। নাশতাও করেনি। ওদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? বললো, মেয়েই আমাদের পছন্দ হয়নি।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘এই ঘটনায় মেয়েটার মনও খুব খারাপ হয়ে গেলো। বললো, বাবা, আমি বিয়েই করবো না। আমি কি এতো অল্প বয়সে তোমাদের বোঝা হয়ে গেছি? তোমরা কি আমাকে দু’বেলা খাওয়াতে পারবে না?’ কথাগুলো বলতে বলতে নীলার বাবার চোখের কোণে পানি চলে এলো।
‘শ্যামলা মেয়েদের বিয়ে দেয়াও আজাকাল বেশ কঠিন। কারণ সমাজে এখন ফর্সা মেয়ের অভাব নেই। ভেবো না, তোমার মেয়েকে বুঝিয়ে বলো, ভাগ্য ভালো হলে কারো না কারো মন পাল্টে যেতেও পারে। সব কালো মেয়ে কি আজীবন বাপের ঘাড়ে বসে থাকে? একদিন আগে বা পরে সবারই তো বিয়ে হয়ে যায়।’
‘তবে যৌতুক ছাড়া কালো মেয়েদেরকে বিয়ে দেয়া খুব কষ্টকর।’ নীলার বাবা বললেন।
‘ঠিক বলেছেন। কালো কেন, অনেক ফর্সা মেয়ের বিয়েতেও এখন যৌতুক লাগে।’
‘কী আর করবো! লাগলে যৌতুক দিয়ে হলেও মেয়েটির বিয়ে দিয়ে দেবো। দেখি, ভাগ্যে কী আছে মেয়েটির।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘ঠিক আছে। দেরি হয়ে যাচ্ছে। আসি তাহলে।’
‘আমিও একটু পর বাজারে যাবো। কিছু মুদি মালও লাগবে। তোমার দোকানে যাবো।’
‘ঠিক আছে। তাহলে দোকানে দেখা হবে।’
৬.
কলেজ শেষে বাড়ি ফিরছিলো নীলা। সাথে ওর ক্লাসমেট জেরিন। ওরা পেছনে। ওদের আগে আগে চলছে ওদের অন্য সহপাঠী মেয়েরা। ওই মেয়েদের সাথে আছে কয়েকটি ছেলেও। দু’টি ছেলে নীলাদের একটু পেছনে। ওদের একজন পেছন থেকে নীলাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো, ‘মা কালী, কেমন আছো?’
কথাটি শুনে নীলা এবং জেরিন পেছনে ফিরে দেখে দু’টি ছেলে ওদের পিছু পিছু আসছে। ওদেরকে দেখেই নীলা পেছন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। ওর মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেলো।
কিন্তু ওদেরকে কিছু বলতে যাবে, জেরিনের চোখেমুখে এমন হাবভাব দেখে নীলা ওকে বললো, ‘জেরিন, কিছু বলো না ওদের। আমি কালো বলেই তো ওরা এমনটা বলছে। কী করবো! এসব মেনেই আমাকে চলতে হবে।’
‘না, কিছু না বললে ওদের শিক্ষা হবে না। ওরা আরো বলবে।’
জেরিন পথে দাঁড়িয়ে রইলো। নীলা সামনে চলে গেলো। পেছনের ছেলেগুলো জেরিনের কাছাকাছি আসতেই জেরিন বললো, ‘কী বলেছিস তোরা?’
‘আমি কিছু বলিনি!’ নাবিল নামক ছেলেটি বললো।
‘তাহলে তুই বলেছিস এটা?’
‘ওর নাম জানা থাকলে ওকে নাম ধরেই ডাকতাম।’ সাগর নামক ছেলেটি বললো।
‘আসলে আমরা ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়েও কাউকে ঠাট্টা না করার শিক্ষা পাইনি। কালো হলে কি তাকে পথে ঘাটে অপমান করতে হবে? আমাদের কোনো আত্মীয় স্বজন কি কালো নেই? তাদেরকে নিয়ে অন্য কেউ তামাশা করলে আমাদের কেমন লাগবে? কালো হওয়া কি দোষ?’
‘ঠিক আছে, আর এমন করবো না।’ সাগর বললো।
জেরিন আর কিছু না বলে সামনে এগিয়ে চললো।
৭.
জেরিন চলে যাবার পর সাগর এবং নাবিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে লাগলো।
নাবিল বললো, ‘আমি তোকে নিষেধ করেছি, তবু তুই ওকে কথাটা বলে ফেললি! মাঝে মাঝে তুই এমন সব কাজ করে বসিস, তোর সাথে চলতে মন চায় না। মেয়েটি কালো, তাই বলে সে কি মেয়ে নয়?’
‘আচ্ছা তুই-ই বল, কালো মেয়ের সমাজে কি কোনো দাম আছে? সুন্দরী কত মেয়ে পড়ে আছে, বিয়ে হচ্ছে না।’ সাগর বললো।
‘এসব নিয়ে তোর এতো মাথাব্যথা কেন? তোকে কি কেউ কালো মেয়েদের দায়িত্ব নিতে বলেছে? নাকি বিয়ে করতে বলেছে? তুই কোনো কালো মেয়েকে বিয়ে করতে না চাইলে করিস না। কিন্তু তুই বিয়ে না করলে কি ওদের বিয়ে বন্ধ হয়ে থাকবে? তুই ক’টা মেয়েকে বিয়ে করতে পারবি? আমি তো দেখি, অনেক সুন্দর ছেলের ভাগ্যে কালো মেয়েই জোটে। তুই যদি আর কখনো ওকে নিয়ে ঠাট্টা করিস, তাহলে তোর সাথে আর সম্পর্ক রাখা যাবে না।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুই চিন্তা করিস না। আর কখনো এমন করবো না।’ একটু থেমে আবার সাগর বললো, ‘একটা প্রশ্ন আছে। জিজ্ঞেস করি?’
‘কী প্রশ্ন?’
‘মনে হয়, মেয়েটিকে তোর বেশ ভালো লাগছে। তুই কি ওর প্রতি বেশ দুর্বল!’
‘দুর্বল, আবার দুর্বল না। তোকে এখনো ওর সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। আমরা একই হাই স্কুলে পড়াশুনা করেছি। জেএসসি পরীক্ষায় আমরা দু’জনই এ প্লাস পেয়েছিলাম। আমাদের ক্লাসে মোট এ প্লাস পেয়েছিল নয় জন। নবম শ্রেণিতে ভর্তির পর রোল নং নির্ধারণের জন্য আমাদের একটি ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হয়। ঐ পরীক্ষায় আমার রোল নং হলো দুই আর ওর রোল নং হলো এক। নবম শ্রেণির প্রথম দু’পরীক্ষায়ও মোট নম্বর হিসেবে ও-ই ছিল সবার উপরে। তবে আমাদের সাথে নবম শ্রেণিতে অন্য স্কুল থেকে এসে নতুন একটি ছাত্র ভর্তি হলো। নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেলো জেরিনের ‘এক’ নিয়ে নিয়েছে নতুন ছেলেটি, ওর হয়ে গেলো ‘দুই’, আমার হয়ে গেলো ‘তিন’। ফলাফল দেয়ার পর থেকে একাধারে চার দিন জেরিন ক্লাসে আসেনি ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণে। পরে শিক্ষকরা ওর গার্ডিয়ানকে ফোন করে ওকে স্কুলে এনে অনেক বুঝিয়ে ক্লাস করাতে রাজি করান। ইন্টার থেকে তুমি ওর সাথে পড়ছো। প্রায় দু’বছর হয়ে গেলো। ক্লাসে ওর পারফরমেন্স কি কখনো তোমার চোখে পড়েনি?’
সাগর বললো, ‘আসলে কলেজে ভর্তির পর ওকে দেখার পর থেকেই ওর প্রতি আমার মনে এক ধরনের ঘৃণা কাজ করছিলো। তাই ক্লাসে ওর ভালো পারফরমেন্সকে কখনো গুরুত্ব দেইনি। তাছাড়া ক্লাসে শিক্ষার্থী অনেক বেশি হবার কারণে ভালো শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেশি। তাই কাউকে আলাদাভাবে ভালো হিসেবে চিহ্নিত করতে বেশ কষ্ট হয়।’
‘হতে পারে।’
‘আচ্ছা, নীলার কাছে ওকে নিয়ে ঠাট্টা করার জন্য ক্ষমা চাইলে কেমন হয়?’
‘দরকার নেই। এখন আবার ক্ষমা চাইতে গেলে ওর আরো খারাপ লাগতে পারে।’
‘ঠিক আছে। তোর কথাই রাখলাম। তবে তোর সাথে কথা বলে আমার দীর্ঘদিনের একটা ইগো দূর হলো। তোকে ধন্যবাদ।’
৮.
নীলার বাবা দোকানে বেচাকেনা করছিলো। নীলাদের পাশের বাড়ির যে লোকের সাথে বাজারে আসার পথে জেরিনের বাবার দেখা হলো, তিনিও দোকানে এসে কিছু কেনাকাটা করলেন।
কেনাকাটা শেষে জেরিনের বাবাকে বললেন, ‘একটু কথা ছিল। ফ্রী হয়ে নিন। আমি বসছি।’
দোকানে যেসব কাস্টমার ছিল, তারা সবাই মালামাল কিনে চলে গেলো।
‘এবার বলুন, কী বলবেন।’ নীলার বাবা বললেন।
‘নীলার বিয়ের ব্যাপারে আমার কাছে একটি প্রস্তাব আছে।’
‘সকালে দেখা হলো। বললেন না তো!’
‘তখন কোত্থেকে বলবো? আমি বাজারে আসার পথে আমার এক খালাতো ভাই ফোন করলো। সে কথায় কথায় বললো ওর ছেলের জন্য নাকি মেয়ে দেখছে। আমি তোমার মেয়ের কথা বলেছি। সে বললো, যদি ভালো মনে করেন, মেয়ের বাবার সাথে আগে কথা বলে দেখতে পারেন, মেয়ে এখন বিয়ে দেবে কিনা?’
‘সামনে নীলার ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষার আগে ওর বিয়ে নিয়ে ভাবতে চাই না।’
‘পাত্র বেশ ভালো। সব সময় এমন ভালো পাত্র পাওয়া যায় না। এখন না হয় কথা বলে রাখতে পারেন। পরীক্ষার পর না হয় বিয়ের কাজে নামা যাবে।’
‘ঠিক আছে। তবে একটা শর্তে মেয়ে দেখানো যাবে।’ নীলার বাবা বললেন।
‘কোনো কঠিন শর্ত নয় তো?’
‘মেয়েকে দেখতে হলে আমাদের বাড়িতে গিয়ে না দেখে ওর কলেজে যাওয়া-আসার পথে দেখতে হবে।’
‘এমন শর্ত কেন?’
‘কারণ মেয়েটি খুব কষ্ট পায় যখন ওকে দেখার পর পাত্রপক্ষ পিছিয়ে যায়।’
‘তাহলে বাড়িঘর দেখতে হবে না?’
‘মেয়ে পছন্দ হলে পরে বাড়িঘর দেখতে পারবে।’
‘ঠিক আছে। আমি আমার খালাতো ভাইকে বলে দেখি। আমি আবার দু’দিন পর চলে যাবো। যা করার এই দু’দিনেই করতে হবে।’
‘ঠিক আছে। আপনি কথা বলে দেখতে পারেন।’
লোকটি দোকান থেকে বের হয়ে কিছু দূর গিয়ে আবার ফিরে এলেন। এসে বললেন, ‘আপনার নাম্বারটা আমার কাছে নেই। নাম্বারটা দিলে ওদের সাথে কথা বলে আপনাকে ফোনে জানাতে পারবো।’
নীলার বাবা লোকটিকে মোবাইল নাম্বার দিলেন।
লোকটি কিছুদূর চলে যাবার পর নীলার বাবা লোকটিকে ডাক দিয়ে বললেন, ‘এই যে শুনুন। আপনাকে তো আসল কথাই জিজ্ঞেস করা হয়নি।’
লোকটি পেছন ফিরে তাকালেন। নীলার বাবার দিকে আসতে আসতে বললেন, ‘ছেলেটির কথা? আমিও ভাবছি, আপনি এখনো ছেলের বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেননি কেন?’
‘আসলে আমি মেয়েটিকে নিয়ে বেশ চিন্তিত। ওর এখন যে বয়স, সে বয়সে ওর জন্য চারদিক থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসার কথা। কিন্তু দু’একটা যা-ও আসছে, কারোই ওকে পছন্দ হচ্ছে না। কী করবো!’
‘এসব চিন্তা বাদ দেন। ভাগ্যে যা লেখা আছে, তা হবেই। আমাদের দরকার চেষ্টা করা। ছেলের বাড়ি বাংলাবাজারের দক্ষিণে এক কিলোর মতো দূরে হবে। ইন্টার পাশ। সৌদি থাকে, এটা জানি। কিছুদিন আগে দেশে এসেছে।’
‘সৌদি তো অনেকেই যায়। সবার অবস্থা তো আর ভালো নয়। ছেলেটির কী অবস্থা?’
‘তা ভালো করে জানি না। পরে আপনিই দেখা হলে ওদের থেকে জেনে নিতে পারবেন।’
‘ঠিক আছে। তাহলে আর আপনার দেরি করাচ্ছি না।’
৯.
নীলা রাতে পড়তে বসেছে। ওর ছোট ভাই রেজা ওকে বললো, ‘আপু, তোমার বিয়েতে আমি অনেক মজা করবো। পটকা ফোটাবো, রং মাখামাখি করবো, আরো কত কিছু! তোমার বিয়ে হচ্ছে না কেন?’
‘আমার বিয়ে হয়ে গেলে তুই খশি হবি মনে হয়?’
‘খুশি হবো না। তবে আমি আব্বুকে বলবো তোমাকে যেন দূরে বিয়ে না দেয়। তাহলে প্রতিদিন তোমার শ^শুর বাড়ি যেতে পারবো, তোমাকে দেখে আসতে পারবো।’ একটু থেমে রেজা আবার বললো, ‘আর আমি না চাইলেও একদিন না একদিন তোমার বিয়ে তো হবেই! কী বলো?’ ‘আমাদের বাড়িতে আমি কখনো কোনো বিয়ে দেখিনি। আমাদের ক্লাসে যারা পড়ে, তারা প্রায়ই তাদের ভাই-বোনের বিয়ে হওয়ার কথা বলে। আমার খুব খারাপ লাগে। আমি তখন শুধু তোমার বিয়ের কথা ভাবতে থাকি। আচ্ছা আপু, তুমি তো এখন বড় হয়েছো। ইন্টারে পড়ছো। এখনো তোমার বিয়ে হচ্ছে না কেন? আমার অনেক ক্লাসমেটের বোন ইন্টারে উঠতেই বিয়ে হয়ে গেলো।’
রেজার কথা শুনে নীলার চোখে পানি চলে এলো। সে ভাবতে লাগলো, ‘আমার ভাগ্য এতো খারাপ কেন! আমার বান্ধবীদেরকে প্রতিদিনই কেউ না কেউ দেখতে আসে। অনেকের বিয়েও হয়ে যায়। আর আমাকে কেউ দেখতেও আসতে চায় না। আমার গায়ের রংটা আমার এতো শত্রু হয়ে গেলো কেন? গায়ের রংটা সাদা হতে পারতো না!...’
‘আপু, কী ভাবছিস? আমি ঠিক করে রেখেছি, তোর বরকে আমি নিজ হাতে ফুলের মালা পরাবো। আমাদের গাঁদা ফুল গাছ আছে না? সেগুলোর ফুল দিয়ে মালা বানাবো।’
‘যদি আমার বিয়ের সময় গাঁদা ফুল গাছে ফুল না থাকে?’
‘তাহলে বাজার থেকে ফুল কিনে এনে মালা বানাবো। আমি ফুল কেনার টাকা জোগাড় করেও রেখেছি আম্মুর কাছে।’
নীলা ভাবতে থাকে, ‘তোর ফুল কিনতে কিনতে আরো কতো বছর লেগে যায়, ঠিক নেই। হয়তো আমার বরকে তোর কখনোই ফুলের মালা পরানোর সুযোগ হবে না।’ এসব ভাবতে ভাবতে মনের কষ্টে নীলার চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি পড়ে গেলো। নীলার চোখ থেকে পানি পড়তে দেখে রেজা বললো, ‘আপু, কাঁছিস কেন? আমার কথায় কষ্ট পেয়েছিস বুঝি? ঠিক আছে আর কখনো তোর বিয়ের কথা মুখে আনবো না।’
নীলা ওড়না দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে, ‘কাঁদছি না। ইদানিং আমার চোখে হঠাৎ করে পানি চলে আসে। ঠিক আছে, তুই পড়তে বস। টাকা জোগাড় করতে থাক। আজ নয়তো কাল, আমার বিয়ে তো হবেই।’ নীলা মনে মনে বলে, ‘আমার কখনো বিয়ে না হলেও একদিন এ বাড়িতে তোর বিয়ে তো হবেই। আমার বরের গলায় ফুলের মালা পরাতে না পারলেও তোর বউয়ের গলায় তো নিশ্চয়ই পরাতে পারবি!’
১০.
রাতে নীলার বাবা খেতে যাবেন, এমন সময় তাঁর মোবাইল বেজে উঠলো। ফোন রিসিভ করার পর ও প্রান্ত থেকে আওয়াজ এলো, ‘কেমন আছেন?’
‘ভালো। কী খবর?’
‘আপনার সাথে বাজারে কথা বলার পর ওদেরকে ফোন করে আপনার শর্তের কথা বলেছি। ওরা আর দেরি করেনি। আজ কলেজে গিয়ে আপনার মেয়েকে দেখে এসেছে। বলেছে, মোটামুটি পছন্দ হয়েছে। এখন বলছে আপনাদের বাড়ি দেখতে যাবে। ওদেরকে কবে আসতে বলবো?’
‘ওদেরকে কি বলেছেন, মেয়ের সামনে ইন্টার পরীক্ষা?’
‘বলেছি। ওরা বলেছে, অসুবিধা নেই, সব ঠিকঠাক থাকলে এখন শুধু কথাবার্তা ফাইনাল করে রাখা হবে। পরীক্ষা শেষ হলে বিয়ে হবে।’ একটু থেমে অন্যপ্রান্তের লোকটি আবার বললেন, ‘ওদেরকে আপনাদের বাড়ি আসার তারিখ দেবো কবে?’
‘আপনি কি আগামী পরশু বাড়ি থাকবেন?’
‘না, আমি পরশু সকালেই চলে যাবো।’
‘তাহলে কাল বিকেলে ওদেরকে আসতে বলুন। ছেলেটিকেও যেন সাথে করে নিয়ে আসে।’
নীলার বাবা যখন ফোনে কথা বলছিলেন, তখন তাঁর ছেলে রেজা এসে তাঁর পাশে দাঁড়ালো। ওর বাবার কথা শেষ হতেই দৌড় দিলো ওর বোনের নিকট। গিয়ে বললো, ‘আপু, আপু, তোর বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে। আব্বু ফোনে কার কাছে জানি বলেছে, তোর পরীক্ষার পরই বিয়ের অন্ষ্ঠুান হবে। আমার কাছে কী যে আনন্দ লাগছে!...’
‘থামবি? এভাবে হৈ হুল্লোড় করছিস কেন? মনে হয় আজই আমার বিয়ে! যে দিন বিয়ে, সেদিন আনন্দ করিস। এখন খেতে যা। সবাই খেতে বসেছে।’
নীলার ধমকে রেজার মন খারাপ হয়ে গেলো। ও গিয়ে ওর আম্মার কাছে বললো, ‘আম্মু, আপু আমাকে বকা দিয়েছে ওর বিয়ের কথা বলাতে। আমি কী দোষ করলাম? বাবাকেই তো একটু আগে দেখলাম ফোনে ওর বিয়ের কথা বলছে।’
‘কিছু মনে করিস না। ওর হয়তো কোনো বিষয়ে মন খারাপ। এখন খেতে বস। আমি ওকে জিজ্ঞেস করবো।’
‘নীলা, কাল বিকেলে তোকে দেখতে আসবে।’ খেতে বসার পর নীলাকে ওর মা বললেন।
‘কে দেখতে আসবে?’ নীলা বললো।
‘একটা বরপক্ষ। ওদের বাড়ি বাংলাবাজারের দক্ষিণে।’
‘আমাকে দেখার কী আছে? আমি দেখতে কেমন, এটা আমাদের এলাকার সবাই জানে। আমার সম্পর্কে আমাদের এলাকার কারো কাছ থেকে জেনে নিলেই তো হয়!’
‘আসলে তোকে দেখতে আসবে না।’
‘তাহলে কেন আসবে?’
‘দেখতে আসবে আমাদের বাড়িঘর, পরিবেশ। তোকে ওরা আজ কলেজে দেখে নিয়েছে তোর অজান্তে।’ নীলার বাবা বললেন।
‘আমাকে যখন দেখেছে, তখন আবার আমাদের বাড়িঘর দেখার কী প্রয়োজন? কেন, ওরা কি মনে করে আমাদের বাড়িঘর নেই? আমরা খোলা আকাশের নিচে থাকি?’ নীলা মন খারাপ করে বললো।
‘না, না। এমনিতে। বিয়ের সময় মেয়েদের বাড়িঘর দেখার একটা প্রচলন আছে। আমরাও ওদের বাড়িঘর দেখবো।’
‘অসুবিধা নেই। দেখতে মনে চাইলে দেখুক। আমাকে কি আবারও দেখবে?’
‘তা জানি না। হয়তো দেখবে না। দেখতে চাইলে তুই দেখা দিবি?’
‘তোমাদের ইচ্ছা।’
১১.
খাওয়া শেষে নীলা পড়তে চলে গেলো। গিয়ে ওর ভাইকে বললো, ‘তুই পড়। আমার ভালো লাগছে না। আমি একটু শুই।’
নীলা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। ভাবতে লাগলো, ‘শেষ পর্যন্ত আমাকে তাহলে পছন্দ হয়েছে একটা বর পক্ষের! ছেলে কী করছে, দেখতে কেমন, কিছুই জানি না। এটাই আমাদের দেশের রীতি। আগে ছেলেপক্ষ মেয়ে দেখে। মেয়ে দেখার মাধ্যমেই শুরু হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। অনেকটা কোরবানীর ঈদের বাজারে গরু দেখার মতো। জানি না, আমাকে কেন ওদের পছন্দ হলো! ছেলে যেমনই হোক, আমি রাজি হয়ে যাবো। একদিকে বাবা-মায়ের বোঝা হয়ে গেছি মনে হয়, অন্যদিকে ছোট ভাইটিও বাড়িতে কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান দেখার জন্য হা-হুতাশ করছে। সবার চাহিদা পূরণ হবে আমার বিয়ে হলে।’
১২.
পরদিন কলেজ ছুটির পর নীলা ওর বান্ধবীর সাথে হেঁটে হেঁটে সিএনজি স্টেশনের দিকে আসছিলো। ওদের পেছন পেছন আসছিলো সাগর এবং নাবিল। কিছুদূর যেতেই সাগর জেরিনকে ডাক দিলো। নাবিল বললো, ‘ওকে ডাকছিস কেন?’
‘তোকে কি বলতে হবে?’
‘উল্টাপাল্টা কিছু করে বসিস না আবার।’ নাবিল বললো।
জেরিন কাছে আসার পর সাগর একটি প্যাকেট এগিয়ে ধরে ওকে বললো, ‘এটা নীলাকে দিস। খুলবি না কিন্তু।’
‘ঠিক আছে।’ বলে নীলার দিকে এগিয়ে চললো জেরিন। সাগর এক জায়গায় বসে ওর বন্ধু নাবিলের সাথে কথা বলতে লাগলো। নাবিল বললো, ‘ওকে আমার সেই ক্লাস নাইন থেকেই ভালো লাগছে। ওর গায়ের রং কালো হলেও চেহারায় দারুণ আর্ট। এসএসসি পরীক্ষার কিছুদিন আগে একদিন আমার ভাবিকে বললাম, ভাবি, একটি মেয়েকে আমার খুব ভালো লাগছে। কী করবো? তুমি কি মা’কে একটু বলবে? আমার মনে হয়, জীবনে কোনো মেয়েকে আমার এতো ভালো লাগবে না।’
ভাবি কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, ‘ছেলেমেয়ে একসাথে পড়ালেখা করতে গেলে যে কোনো ছেলে যে কোনো মেয়ের প্রেমে পড়ে যেতে পারে। যে কোনো মেয়েও যে কোনো ছেলের প্রেমে পড়ে যেতে পারে। মেট্রিক বা ইন্টারে পড়া অবস্থায় এমন হওয়াটা ক্রাশ ছাড়া কিছু নয়। অনেক মহিলা শিক্ষককেও অনেক ছাত্রের পছন্দ হয়ে যেতে পারে। অনেক পুরুষ শিক্ষককেও অনেক মেয়ের ভালো লেগে যেতে পারে। হয়ও অনেক সময়। কী বলিস?’
‘ঠিক বলেছো।’
একটু থেমে ওর ভাবি আবার বললেন, ‘পাঁচ বা দশ বছর বয়সী একটি শিশুকে বিয়ে করানোটা যেমন ঠিক নয়, তেমনি, তুই মেচিউরড হলেও কী হবে, তোকে এখন বিয়ে করানোটাও সেরকম ঠিক নয়। আচ্ছা বল, তুই যদি এখন বিয়ে করিস, তুই কি একটি সংসার চালাতে পারবি?’
‘পারবো না। কিন্তু...’
‘আগে পড়ালেখা শেষ হোক, একটা ভালো চাকরি পেলে এরকম ভালো একটা মেয়ে খুঁজে নিস। হয়তো আরো বেশি পছন্দের মেয়েও তখন পেয়ে যেতে পারিস ভাগ্য ভালো হলে। আর তুই না চাইলেও আমরাই তখন তোর জন্য ভালো দেখে একটি মেয়ে খুঁজে নেবো।’ একটু থেমে ওর ভাবি আবার বললো, ‘আমাদের প্রতি তোর এই বিশ্বাসটা নেই?’
‘অবশ্যই আছে। কিন্তু...’
‘কোনো কিন্তু-টিন্তু নেই। ঘরের কাউকে তোর এই কথাটা বললে সবাই কী ভাববে, ঠান্ডা মাথায় একটু চিন্তা করে দেখিস।’
‘ঠিক আছে ভাবি, তাহলে ভাগ্যের ওপরই ছেড়ে দিই বিষয়টা।’
‘ভাগ্যে বিশ^াস রাখ। ভাগ্য তোর পক্ষে হলে যে কোনো ইচ্ছে পূরণ হতে পারে।’
নাবিলের কথা শেষ হলো। কিছুক্ষণ পর সাগর বললো, ‘তোর সাথে বন্ধুত্ব সেই ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার থেকে। এতোদিন আমাকে কথাগুলো বলিসনি কেন?’
‘বলিনি। কারণ তুই হয়তো আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করবি, এই জন্য। আমি তো তোর মেন্টালিটি বুঝি। কালো মেয়েদের প্রতি তোর অনীহা তো সেদিন নিজেই প্রকাশ করলি। আমি ভাবতেও পারিনি তুই এমন একটা কান্ড করে বসবি।’ নাবিল বললো।
‘আসলে সেদিনের পর থেকে আমার ধারণা পরিবর্তন হতে শুরু করলো। এখনো ঘটনাটি মনে হলে নিজের কাছে নিজেই লজ্জিত হই। একটা বিষয় ইদানিং আমার মনে আসে প্রায়ই, কালো হওয়াটা মোটেই দোষণীয় নয়। তবু দেখতে ভালো না লাগার কারণে আমরা কালো মানুষগুলোকে অনেক সময় অবজ্ঞা করি। ওদের সাথে আমাদের ডিফারেন্স শুধুই ত্বকের রংয়ে, আর কোথাও নয়।’
‘ঠিক বলেছিস। আমি ভাবি কি জানিস? আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছে, দেখতে সুন্দর। কিন্তু তাদের কাজকর্ম খুব খারাপ। এসব মানুষ সুন্দর হওয়া সত্ত্বে মানুষ এদেরকে দেখতে পারে না। আবার কিছু মানুষ আছে, যারা দেখতে কালো হলেও তাদের কাজের কারণে, তাদের আচরণে মানুষ তাদের উপর খুব সন্তুষ্ট। কালো হবার কারণেও তারা সমাজে জনপ্রিয়। তাহলে কালো মানুষকে আমরা অবজ্ঞা করার কী আছে!’
‘অনেক কথা হলো। চল, এবার বাসায় ফিরি।’ সাগর বললো।
১৩.
পরদিন বিকেলে নীলাদের বাসায় ছেলেপক্ষ আসে। নীলার মা ওদের জন্য কয়েক পদের পিঠা তৈরি করেন। আপ্যায়ন শেষে ছেলের বাবা নীলার বাবাকে বললেন, ‘নীলা কোথায়? আমাদেরকে একটু দেখানো যাবে? কাল কলেজ থেকে আসার পথে আমার ছেলে ওকে দেখেছে। আমি তো এখনো দেখিনি। তাছাড়া রাস্তঘাটে দেখা আর বাসায় দেখা এক কথা নয়।’
নীলার বাবা ‘ঠিক আছে। আমি ওকে নিয়ে আসছি’ বলে ভেতরে গিয়ে নীলাকে ডেকে আনলেন। নীলা এসে সবাইকে সালাম দিলো। ছেলের বাবা নীলাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমাদের ফাইনাল পরীক্ষা কবে?’
‘আগামী মাসের ৫ তারিখ থেকে শুরু।’
‘আমাদের ছেলে তোমার সাথে একটু কথা বলতে পারবে?’ ছেলের বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
নীলা ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়লো।
নীলাকে দেখতে আসা ছেলেটি নীলার সামনেই উপবিষ্ট ছিল। সে বললো, ‘আমার নাম রাহাতুল ইসলাম। আমি সৌদি থাকি। তিন বছর পর দেশে এসেছি।’
ছেলেটির দিকে নীলা একবার তাকিয়েই আবার মুখ নিচু করে ফেললো। ছেলেটিও বেশি সুন্দর নয়। শ্যামলা।
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বললো না। শেষে ছেলেটি নীলার দিকে এক হাজার টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘এটা নিন।’ নীলা প্রথমে নিতে চাইলো না। পরে ছেলেটির বাবা বললেন, ‘নাও, মা। ও খুশি হয়ে তোমাকে দিয়েছে।’
নীলা কিছুটা ইতস্তত করে টাকাটা হাতে নিলো।
ছেলের বাবা বললেন, ‘আমরা তাহলে আসি। আপনারা কখন আমাদের বাড়ি আসবেন? আপনারা আমাদের বাড়ি যাওয়ার পর যদি আমাদেরকে পছন্দ হয়, তখন সেখানেই বিয়ের দিন-তারিখ নিয়ে কথা বলা যাবে।’
নীলার বাবা বললেন, ‘আমরা কোন দিন গেলে আপনাদের সুবিধা হয়?’
‘সামনের শুক্রবারেই আসুন। আমার এক ভায়রাও থাকবেন। শুক্রবার ছাড়া তিনি সময় দিতে পারবেন না।’ একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘শুক্রবার দুপুরেই আসুন। দুপুরের খাবার আমাদের বাড়িতে খাবেন।’
‘না, না আমরা বিকেলে যাবো। গরম যেভাবে পড়ছে, এখনকার দিনে দুপুরের আগে কোথাও বের হওয়া বেশ কষ্টকর।’
‘ঠিক আছে, আপনাদের যখন সুবিধা হয়।’
১৪.
সন্ধ্যায় পড়তে বসার পর নীলার মোবাইল (ফিচার ফোন) বেজে উঠলো। নীলা ফোন রিসিভ করার পর ও-প্রান্ত থেকে নীলার বান্ধবী জেরিন বললো, ‘নীলা, তুই আজ এতো তাড়াহুড়া করে বাড়ি চলে গেলি কেন? ছুটির পর দেখলাম তুই নেই। তোর মোবাইলেও কল ঢুকছিল না। তোকে অনেক খুঁজলাম। শেষে নাবিল বললো, তোকে নাকি বাড়ি চলে যেতে দেখেছে।’
‘আমার মোবাইল তো খোলাই ছিল। গাড়িতে থাকার সময় হয়তো কল করেছিস।’
‘আমাকে না বলে চলে গেলি কেন? কোনো জরুরী কাজ ছিল?’
‘তোকে বলেই আসতাম। কিন্তু ছুটির পর হঠাৎ তোকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ভাবলাম, হয়তো ওয়াশরুমে গিয়েছিস। এজন্য ফোনও করিনি। পরে ফোন করতেও ভুলে গেছি।’
‘কেন এমন তাড়াহুড়ো করে বাড়ি চলে গেলি? কোনো মেহমান আসার কথা ছিলো বাড়িতে?’
‘না। সেরকম কিছু না।’ নীলা বললো।
‘আমাকে বলা যাবে না? কিছু লুকাচ্ছিস মনে হয়!’
‘বলা যাবে। কিন্তু বলতে ইচ্ছে করছে না।’
‘বললে কি কোনো সমস্যা হতে পারে?’
‘আচ্ছা বলছি। তুই তো দেখছি না জেনে ছাড়বি না।’ একটু থেমে নীলা আবার বললো, ‘আজ একটা ছেলেপক্ষ আমাকে দেখতে এসেছে।’
‘এজন্যই লুকাচ্ছিস! তোকে কি ওদের পছন্দ হয়েছে? বিয়ের দিন-তারিখ সব কি ঠিক হয়ে গেছে?’
‘আরে না না, এসব কিছুই না। দিন-তারিখ ঠিক হলে তোকে তো অবশ্যই ফোনে জানাতাম। ওরা আমাকে দেখে গেছে শুধু। সামনের শুক্রবারে আমাদেরকে ওদের বাড়ি যেতে বলেছে।’
‘তাহলে তো নিশ্চয়ই তোকে পছন্দ হয়েছে। পছন্দ না হলে ওরা কি তোদেরকে ওদের বাড়ি যেতে বলতো?’
‘জানি না।’
‘এটা জানার কিছ্ইু নয়। এটা বুঝার বিষয়। আমার সাথে লুকোচুরি করিস না। তোকে কি আংটি পরিয়ে গেছে?’
‘আংটি পরায়নি, আমাকে এক হাজার টাকা দিয়েছে।’
‘আমি তোকে তো প্রায়ই বলি, কোনো না কোনো পক্ষ তোকে পছন্দ করবেই। তুই কি দেখতে এতোই খারাপ? এখন দেখ, আমার কথা সত্য হয়েছে কিনা!’
‘তুই যেভাবে বলছিস, মনে হয় আমার বিয়েই হয়ে গেছে!’
‘বিয়ে না হলেও তো হবার পথে। মানুষ রান্না করে চাল। কিন্তু কেউ যদি জিজ্ঞেস করে ‘কী করছেন?’, তখন বলে, ‘ভাত’ রান্না করছি। অথচ মাত্র রান্না বসিয়েছে। এখনো ভাত হতে অনেক দেরি। মানুষ ছেলের জন্য দেখতে যায় মেয়ে, কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে, ছেলের জন্য ‘বউ’ দেখতে গিয়েছি। এভাবে তোর বিয়েও তো হবার পথে। তাই, ‘বিয়ে হয়ে গেছে’ বললেও ভুল হবে না, কী বলিস?’
‘তোর এসব যুক্তি রাখ। আমার মতো একটা মেয়ের বিয়ে হবে, এখনও তা ভাবতে আমার কষ্ট হয়।’
‘এখন যা-ই বলিস, সামনের শুক্রবারের পর আমার মনে হয় তোর মুখে এমন কথা আর শোনা যাবে না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। দেখা যাবে। এখন রাখ। সন্ধ্যার পর থেকে এখনো কোনো সাবজেক্ট-ই পড়া হয়নি।’
‘ঠিক আছে, রাখছি। সামনের শুক্রবারের অপেক্ষায় থাকলাম। জানাবি কিন্তু। রাখি।’
১৫.
পরদিন সিএনজি স্টেশন থেকে কলেজে যাবার পথে জেরিন নাবিলকে দেখে পেছন থেকে ডাক দিলো। নাবিল জেরিনের ডাক শুনে থেমে গেলো।
‘একটা ভালো খবর আছে।’ জেরিন বললো।
‘কী খবর। তাড়াতাড়ি বল। ভনিতা করিস না। আমার আবার এসব বিষয়ে দেরি সহ্য হয় না।’
‘নীলার বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে। ছেলেপক্ষ ওকে দেখে গেছে। সামনের শুক্রবার নীলার বাবা ছেলেদের বাড়ি যাবে। ওখানেই নাকি বিয়ের কথাবার্তা ফাইনাল হবে।’
জেরিনের কথা শোনার পর নাবিল কোনো কথা না বলে থেমে রইলো। সাগর কোন্ দিক থেকে এসে বললো, ‘এই, তোরা কিসের কথা বলছিস এখানে বসে বসে?’
‘কেন, নীলার বিয়ের কথা। নীলার বিয়ের কথাবার্তা অনেকটা ফাইনাল।’
‘কী বলছিস?’ সাগর যেন অনেকটা হতাশ হয়ে বললো। কিন্তু কাউকে বুঝতে দিলো না ওর হতাশা।
নীলা যা জানে সব ওদেরকে খুলে বললো।
শেষে বললো, ‘নাবিল, তোকে প্রথমে নীলার বিয়ের কথা বলাতে তোর মুখ এমন ফ্যাকাসে হয়ে গেলো কেন?’
‘ও বলবে না। আমি বলছি।’ সাগর বললো।
‘আচ্ছা, বল।’ জেরিন বললো।
‘ও নীলাকে স্কুল জীবন থেকে পছন্দ করে। নীলাকে ভালো লাগার কথা ও ওর ভাবিকে একবার বলেছেও। কিন্তু ওর ভাবি ওকে এই বয়সে এসব যে সঠিক নয়, তা ভালোভাবে বুঝিয়ে বলায় ও বিষয়টা আর বাড়ায়নি। নয়তো শেষে ঘটনা কোন্ দিকে গড়াতো, কে জানে! এতোদিনে হয়তো ওরা বিয়ে করে কয়েকটা বিয়ে বার্ষিকীও পালন করে ফেলতো! আর কিছু বললাম না!’ এসব বলে হাসতে থাকলো সাগর।
‘আচ্ছা, তুইও কি ওকে পছন্দ করিস না? শুধু আমার কথা কেন বলছিস?’ নাবিল সাগরকে জিজ্ঞেস করলো।
‘আমি? নীলাকে?’
‘এমনভাবে কথা বলছিস, যেন মাছ থেকে কাঁটা ছড়াতেও জানিস না! তুই সেদিন ওকে কী দিয়েছিস? লাভ লেটার, নাকি অন্য কিছু? প্যাকেটটা এতো বড় হলো কেন? কী ছিল ভেতরে?’
‘আচ্ছা, তুই নিজেই বুঝিস, এখন আমাদের বিয়ের সময় নয়। তবু আমার প্রতি তোর এমন ধারণা হলো কী করে! ওকে ভালোবেসে আমার এখন কী লাভ হবে? বিয়ে করতে পারবো?’ সাগর বললো নাবিলকে।
নীলাকে এদিকে আসতে দেখে জেরিন বললো, ‘নীলা এদিকে আসছে। ক্লাসেরও সময় হয়ে গেছে। চল।’
১৬.
কলেজ ছুটির পর জেরিন নীলাকে বললো, ‘নীলা, একটা কথা শুনবি?’
নীলা জেরিনের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো।
‘তুই হয়তো জানিস না, নাবিল তোকে স্কুলজীবন থেকেই ভালোবাসছে। কিন্তু সাহস করে তোকে কখনো কিছু বলতে পারেনি। কথাটা একদিন সে ওর ভাবিকে বলায় ওর ভাবি ওকে এ ব্যাপারে বুঝিয়ে বলে। তাই সে আর সামনে পা বাড়ায় নি।’ একটু থেমে জেরিন আবার বললো, ‘তোকে একটা প্রশ্ন করার ছিল। কিন্তু এখনো করা হয়নি। সাগর তোকে সেদিন প্যাকেটে করে কী দিল রে?’
‘কী দেবে আর! ওর আচরণের জন্য দুঃখিত হয়ে ক্ষমা চাওয়ার কথা একটি কাগজে লিখে দিয়েছে।’
‘সেটা কি বড় চিঠি ছিল? কয় পৃষ্ঠার চিঠি ছিল? তুই সব কিছু আমার কাছ থেকে লুকাচ্ছিস।’
‘চিঠি কেন হবে? একটি কাগজে লিখে দিয়েছে, ‘দুঃখিত’। আরো দু’একটা বাক্য অবশ্য লিখেছে। তা বলে আর কী লাভ! এবার কি তাহলে বলবি, সাগরও আমাকে পছন্দ করে? তুই এসব আজগুবি কথা কোত্থেকে বলিস!’
‘আজগুবি? তোকে আজগুবি খবর দিয়ে আমার কী লাভ! আচ্ছা, বললি না তো, সাগর তোকে কাগজটির সাথে আর কী দিয়েছে? প্যাকেটটি এতো বড়...’ জেরিন প্রশ্ন করা শেষ করতে না করতেই নীলা বললো, ‘আমার কথা রেখে এবার তোর কথা বল। তোর বোনের হবু বর দেশে ফিরবে কবে?’
‘বলিস না। এ পর্যন্ত কয়েকটা তারিখ মিস করলো। আরিফও এ ব্যাপারে খুব অসন্তুষ্ট। বলছে, আপুর বিয়ের যদি আর ছয় মাস দেরি হয়, তাহলে আমরা সবাইকে রাজি করিয়ে বিয়ে করে ফেলবো। কিন্তু আমি আরিফকে বলেছি, এটা ঠিক হবে না। বিদেশের মানুষের ছুটিছাটা নিয়ে অনেক অসুবিধা হয়। তোমার ছুটি নিয়ে তো অসুবিধা নেই। যদি আপুর বিয়ে হতে একবছরও লেগে যায়, যাক। আপুর বিয়ের আগে আমরা বিয়ে করা ঠিক হবে না। আপুর বিয়ে হয়ে গেলে আমরা আর একমাসও দেরি করবো না।’
‘ভালোই। ইন্টার পাশ করলে আমরা কে কোথায় ভর্তি হই, ঠিক নেই। যেখানেই থাকি, বিয়ের তারিখ ঠিক হলে কিন্তু জানাবি। দাওয়াত না দিলেও চলে যাবো। কি বলিস?’
‘তুই তো তখন তোর শ^শুরবাড়ি থাকবি। তোকে কি আর খুঁজে পাওয়া যাবে?’
‘আমি কখনো এডভান্স চিন্তা করি না। বিশেষ করে আমার বিয়ের ব্যাপারে। আমার মনে হয়, আমার সহজে বিয়ে হবে না।’
‘ঠিক আছে। দেখা যাবে।’
১৭.
নীলা রাতে পড়ালেখা শেষ করে শুয়ে গেলো। শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকলো, ‘নাবিল আমাকে স্কুল জীবন থেকে ভালোবাসে? কখনো তো বুঝতেই দেয়নি আমাকে। নাবিল আমাকে ভালোবেসে কী লাভ হবে! নাবিল তো আমাকে বিয়ে করতে পারবে না। ওর ভাবিও তো ওকে এই বিষয়টাই বুঝিয়ে দিয়েছে। আর এটাই বাস্তব।’ কথাগুলো ভেবে নীলা সাগরের দেয়া প্যাকেটটি হাতে নেয়। ভাবে, ‘সাগর এটা কেন দিয়েছে আমাকে? ওর অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্য হিসেবে, নাকি আমাকে ভালোবেসে। কিন্তু আমাকে ভালোবাসার কী আছে? একটা কালো মেয়েকে কি কেউ ভালোবাসতে পারে? ভালোবাসা তো এসেছে সুন্দর মেয়েদের জন্য। তাছাড়া নাবিল আর সাগর তো একই লেবেলের। আমার ক্লাসমেট। নাবিল যদি আমাকে ভালোবেসে কোনো লাভ না হয়, সাগরের কী লাভ হবে!’ এসব ভাবতে ভাবতে নীলার ঘুম এসে যায়।
১৮.
নীলাদের ঘরে নীলাকে এঙ্গেজমেন্টের রিং পরিয়েছে লিটন। সেখানে আছে নীলার মা, নীলার বাবা, নীলার মামা। আছে লিটনের ছোট ভাই, বাবা, মা এবং খালু। সবাই খুশি। নীলার বাবা সবাইকে মিষ্টিমুখ করাচ্ছেন। এসময় দরজায় কলিং বেলের শব্দ হলো। নীলার বাবা দরজা খুলে দিলেন। নীলার ক্লাসমেট নাবিল নীলার বাবাকে সালাম দিয়ে বললো, ‘আমি নীলার ক্লাসমেট। একটু ভেতরে আসতে পারি?’
‘এসো।’
নাবিল এসেই নীলার হাত থেকে রিংটি খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। বললো, ‘নীলাকে আমি ভালোবাসি। ওকেই আমি বিয়ে করবো।’ এই বলে নাবিল ওর পকেট থেকে একটি রিং বের করে নীলার হাতে পরিয়ে দিলো। নীলার বাবা বললেন, ‘এই ছেলে, তুমি কী করছো? এতো সাহস তোমার হলো কেত্থেকে? তুমি আমার বাড়ি এসে আমাকে না বলে আমার মেয়ের হাতে রিং পরাও!’
নীলার বাবা কথাটি বলতে না বলতেই খোলা দরজা দিয়ে সাগর নীলাদের ঘরে ঢুকে গেলো। সে এসেই নীলাকে ‘তোমাকে এই রিং পরিয়েছে কে?’ বলেই রিংটি খুলে ফেলে দিয়ে নিজের পকেট থেকে একটি রিং বের করে নীলাকে পরাতে যাবে, এমন সময় লিটন এবং নাবিল ওকে ধরে ফেললো। নীলার বাবাও সাগরের হাত থেকে রিংটি নেয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। শুরু হলো তাদের ধস্তাধস্তি। সবাই হৈ-হুল্লোড় করতে লাগলো।
১৯.
নীলার বাবা এবং মা ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন। হঠাৎ ওর মা জেগে গেলেন একটি গোঙ্গানীর আওয়াজ শুনে। জেগেই বসে গেলেন। শুনতে পেলেন, ঘুমের ঘোরে নীলার গোঙ্গানীর শব্দ হচ্ছে। তাড়াতাড়ি নীলার বিছানার পাশে গিয়ে নীলাকে ডাকতে লাগলেন, ‘নীলা, এই নীলা, এমন করছিস কেন?’
মায়ের উচ্চ শব্দের ডাকে নীলা জেগে গিয়ে বসে গেলো। বললো, ‘মা, খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। মনে হচ্ছিলো, ঘটনাটি বাস্তবেই ঘটছে। এখন দেখি তা স্বপ্ন ছিল। কী যে কষ্ট হচ্ছিলো!’
নীলার মা বললেন, ‘সবাই মাঝে মাঝে এমন দুঃস্বপ্ন দেখে। যা, ঘুমিয়ে পড়।’
২০.
যার সাথে নীলার বিয়ের ব্যাপারে কথা হচ্ছিলো, নীলার বড় মামাকে সাথে নিয়ে নীলার বাবা ওদের বাড়িতে গেলেন পরের শুক্রবার বিকেলে। ছেলেদের ঘরে বসে নীলার বাবা ছেলের বাবাকে বললেন, ‘ইনি হচ্ছেন নীলার বড় মামা। নীলার মামারা চার জন। আর তিনজনের কাউকে আনতে পারলাম না। আর আমার কোনো ভাই নেই। বোন আছে দু’জন। ওদের কারো স্বামী বাড়িতে নেই।’
‘আর ইনি হচ্ছেন আমার ছোট ভায়রা।’ ছেলেটির বাবা একজন মধ্যবয়সী লোককে দেখিয়ে বললেন। একটু থেমে আবার বললেন, ‘অন্য কাউকে বলেও এই অনুষ্ঠানে রাখতে পারিনি। সবাই বলেছে, পরের অনুষ্ঠানে আসার চেষ্টা করবে।’
এরই মধ্যে নাশতা নিয়ে প্রবেশ করলো ছেলেটির ছোট ভাই। সে নাশতা নিয়ে আসার পর ছেলেটির বাবা বললেন, ‘এ হচ্ছে আমার ছোট ছেলে। ডিগ্রীতে পড়ছে। আমার কোনো মেয়ে নেই।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘নাশতা নিন সবাই।’
টেবিলের এক পাশে রাখা ফলের প্যাকেটের দিকে দেখিয়ে নীলার বাবা ছেলের বাবাকে বললেন, ‘এগুলো ভেতরে নিয়ে যেতে বলুন।’
‘কেন আবার এগুলো আনতে গেলেন?’
‘তেমন কিছুই তো আনিনি।’
ফলগুলো ছেলের ছোট ভাই ভেতরে নিয়ে গেলো।
ছেলের বাবা নীলার বাবাকে বললেন,‘আপনিই কথা শুরু করুন।’
‘না, আপনারা বলুন। আমি কী বলবো!’ নীলার বাবা বললেন।
ছেলের বাবা তাঁর ভায়রার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি যা বলার বলুন।’
‘আপনারা তো আমাদের বাড়িঘর দেখেছেন। কেমন লেগেছে?’
‘ভালো।’ নীলার বাবা বললেন।
‘আমাদের কোনো বিষয়ে কোনো আপত্তি থাকলে বলুন।’
‘কোনো আপত্তি নেই।’ কথাটি বলে সামনে উপবিষ্ট ছেলেটির দিকে তাকিয়ে নীলার বাবা বললেন, ‘তোমার নামও তো এখনও জানা হয়নি।’
ছেলেটি বললো, ‘জাহিদুল হাসান লিটন।’
‘পড়ালেখা কতটুকু করেছো?’
‘ইন্টার পাশ করেছি।’ লিটন বললো।
লিটনের কথা শেষ হতেই লিটনের খালু বললেন, ‘লিটন ইন্টার পাশ করেই একটি ভালো ভিসা পাওয়ায় বছর তিনেক আগে সৌদি চলে যায়। কিন্তু যে কাজের ভিসায় গেছে, তাকে সে কাজ না দিয়ে দেয়া হয়েছে অন্য কাজ। তাই সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে সেখানে অবৈধ হয়ে যায়। পালিয়ে পালিয়ে কাজ করে। ভালোই ইনকাম ছিল। যে টাকা ঋণ করে বিদেশ গেছে, সে টাকা পরিশোধ করে দু’বছরের মধ্যেই। কিন্তু তিন বছরের মাথায় সে ধরা খেয়ে দেশে ফিরে আসে। ভাবছে এবার কাতার যাবে। ভাষাও সৌদির মতোই। তেমন সমস্যা হবে না।’
‘কাতারের ভালো কোনো ভিসা পেয়েছে?’ নীলার বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
‘কাতারের একটি ভিসা আছে একজনের কাছে। চার লাখ টাকার মতো চায়।’ কিছুক্ষণ থেমে লিটনের খালু আবার বললেন, ‘কিন্তু আমাদের কাছে আছে মাত্র এক লাখ টাকা। তাই আমরা ভেবেছি ওকে বিয়ে করাবো।’ এই কথা বলে একটু থামলেন লোকটি। থেমে নীলার বাবার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
‘বুঝলাম না।’ কিছুক্ষণ ভেবে নীলার বাবা বললেন।
‘আমরা ভাবছি বিয়ে করিয়ে ওর শ^শুরদের কাছ থেকে, ধার হোক বা এমনি হোক, কিছু টাকা নিয়ে ওকে কাতার পাঠাবো।’ লিটনের বাবা বললেন।
কেউ কিছু না বলে অনেকক্ষণ থেমে রইলেন।
শেষে লিটনের খালুই মুখ খুললেন। বললেন, ‘লিটনের জন্য এর আগেও আমরা কয়েকটা মেয়ে দেখেছি। মেয়েগুলো বেশ পছন্দের হলেও সবাই গরীব ঘরের মেয়ে। এতো টাকা দিতে পারবে না। তাই আমরাও ওদের অবস্থা দেখে টাকার কথা না বলে পিছপা হয়ে গেছি। নয়তো সবাই আমাদেরকে পছন্দ করেছে।’
নীলার মামা এবার বললেন, ‘কত টাকা দিতে হবে?’
‘লাখ তিনেক টাকা দিলেই হবে। সব মিলিয়ে চার লাখ টাকার মতো লাগবে। আপনারা পারবেন আশা করি। আপনাদের মেয়ে এখানে বেশ সুখেই থাকবে। বিয়ের সময় আমরা আপনাদেরকে আর বেশি কোনো চাপ দেবো না। আমাদের ত্রিশ-চল্লিশজন মানুষ খাওয়ালেই চলবে। আপনারাও পনেরো বিশজন আসবেন আমাদের বাড়িতে।’ লিটনের খালু বললেন।
নীলার বাবার কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখা দিলো। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, ‘আমরা আপনাদেরকে দু’চারদিনের মধ্যেই জানাবো। এখন তাহলে আসি।’
লিটনের ছোটভাই ফল নিয়ে এলো প্লেটে করে। সাথে চা-ও নিয়ে এলো।
লিটনের বাবা বললেন, ‘না না, চা খেয়ে যান।’
‘এখন আর চা খাবো না।’ বলে নীলার খালু নীলার বাবার হাত ধরে বেরিয়ে এলেন।
২১.
‘কী করবো। জায়গা-জমি থাকলেও কিছু বিক্রি করে নীলাকে এখানে বিয়ে দিতাম। এর চেয়ে ভালো পাত্র কি আর পাওয়া যাবে। আর অনেকে তো নীলাকে পছন্দই করছে না। ডিপিএসটা করেছি ওর বিয়ের জন্যই। কিন্তু ওরা যা চাচ্ছে, ডিপিএসটা ভাঙলেও সেটা হবে না। এখন কী হবে!’ নীলার বাবা রাতে নিজেদের কক্ষে বসে নীলার মা’কে কথাগুলো বলছিলেন।
‘চিন্তা করো না। দেখো বাকি টাকা কোনো দিক থেকে ম্যানেজ করা যায় কিনা! মেয়েকে তো বিয়ে দিতে হবে। ওর বিয়ের বয়স হয়েছে আরো আগেই। ওর সাথের অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে আরো আগে। আমরা না হয় কয়েকটা বছর কষ্ট করলাম। দেখো, বাকি টাকা কোথাও থেকে লোন নিতে পারো কিনা!’ নীলার মা বললেন।
নীলা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ওর বিয়ে নিয়ে ওর বাবা-মায়ের কথাবার্তা শুনতে লাগলো। ওর কান্না এসে গেলো ওদের কথা শুনে। শেষে বাবা-মায়ের কাছে এসে কান্নাজড়িত কন্ঠে বললো, ‘তাহলে তোমরা আমার যৌতুকের জন্য আমার নামে ডিপিএস খুলেছিলে? আমাকে বললে কী হতো! আমি এখন না, কখনোই বিয়ে করবো না। আমি পড়ালেখা করে চাকরি করবো। তোমরা আমাকে শুধু পড়ালেখা করাও। আমার জীবন আমিই চালাতে পারবো। আমার জন্য যে ডিপিএসটা করেছো, সে ডিপিএসের টাকা রেজার উচ্চশিক্ষার জন্য খরচে করো।’ এই বলে নীলা ওর কক্ষের দিকে চলে গেলো। রেজা নীলাকে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপু, কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন?’
‘আমাদের বাড়িতে বিয়ের কোনো অনুষ্ঠান হবে না, রেজা। শুধু তোর আনন্দের জন্য সেদিন ছেলেপক্ষ আমাকে দেখতে আসায় আমি বিয়েতে রাজি হয়েছি। কিন্তু ওরা আমাদের কাছে তিন লাখ টাকা যৌতুক চাইছে।’
‘যৌতুক কী, আপু?’
‘আমাদের দেশে যেসব মেয়ের বিয়ে হয় না, তাদের বিয়ে দিতে চাইলে বরপক্ষকে টাকা দিতে হয়। এটাই যৌতুক।’
‘কেন, টাকা দিয়ে ওরা কী করবে? ওদের টাকা পয়সার অভাব থাকলে ওরা চাকরি করুক। ব্যবসা করুক। আমাদের কাছে টাকা চাইবে কেন?’
‘রেজা, দুঃখ করিস না। আমার বিয়ে না হলেও একদিন আমরা আমাদের বাড়িতে বিয়ের আয়োজন করবোই। অনেক মজা করবো।’ কাঁদতে কাঁদতে বললো নীলা।
‘কার বিয়ের আয়োজন?’
‘এখন আর কিছু জিজ্ঞেস করিস না। আমার ভালো লাগছে না। ঘুমাতে যা।’
রেজাকে ঘুমাতে যেতে বলে নীলা জেরিনকে ফোন করলো। ফোন করে ছেলেদের বাড়িতে ওর বাবা যাবার পর যা ঘটলো, সব বললো।
২২.
পরদিন কলেজে যাবার পথে কলেজের গেটের একপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জেরিন আগেরদিন ঘটে যাওয়া নীলার ঘটনাটি বলতে থাকে নাবিল এবং সাগরের কাছে। সব শুনার পর সাগর বললো, ‘ছেলেটির বাবার ফোন নাম্বার জোগাড় করা যাবে?’
‘কী জন্য?’ জেরিন বললো।
‘আমি তাঁকে শুধু জিজ্ঞেস করবো, মানুষ কেন বিয়ে করে? টাকার জন্য?’
‘দরকার নেই। যখন বিয়েটা হচ্ছেই না, তখন আর বাড়তি ঝামেলা করে লাভ নেই। দেশে এখনো একটা শ্রেণি যৌতুকের উদ্দেশ্যেই বিয়ে করে। কিছুই করার নেই।’ নাবিল বললো।
নীলাকে আসতে দেখে সাগর বললো, ‘চল, নীলা আসছে। ও মনে করতে পারে হয়তো আমরা ওকে নিয়েই আলোচনা করছি।’
২৩.
[এই ঘটনার পর চার বছর পার হয়ে গেলো। নীলা বিয়ের জন্য কোনোভাবেই রাজি হলো না। নীলার অনার্সও কমপ্লিট হলো একই কলেজ থেকে। নাবিল ও সাগর ইন্টার পাশের পর জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হলো। জেরিনের বিয়ে হয়ে গেলো আরিফের সাথে। তবে বিয়ে হওয়ার পরও সে নীলার সাথে একই কলেজে অনার্স করলো। নীলার ছোট ভাইটিও ঢাকার একটি ভালো কলেজে ইন্টারে ভর্তি হলো। অনার্স ফলাফল প্রকাশের পর নীলা চাকরি খুঁজতে শুরু করলো। একদিন একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পনীতে নীলা ইন্টারভিউ দিতে গেলো।]
নীলা ওয়েটিং রুমে বসেছিলো। তার সাথে ছিল আরো কয়েকজন চাকরিপ্রার্থী। এসময় নীলার ফোন বেজে উঠলো। নীলার মামার ফোন ছিলো। নীলার মামা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিরে, কী অবস্থা?’
‘ওয়েটিং রুমে বসে আছি। ভয়ে বুক কাঁপছে।’
‘টেনশন করিস না। টেনশন করলে ইন্টারভিউ খারাপ হবে। তোর সিরিয়াল নাম্বার কত?’
‘আমার আগে ২৩ জন গেছে। আমার সাইন নিয়েছে ২৬ নাম্বার সিরিয়ালে। মামা, দোয়া করো, যেন ভালো হয়।’
ভাইভা বোর্ডে নীলার আগের এক ছেলে প্রার্থীর ইন্টারভিউ নেয়া হচ্ছে। ভাইভা বোর্ডে চার-পাঁচজন লোক ছিলো। আগে অনেকগুলো প্রশ্ন করার পর একজন ওকে প্রশ্ন করলেন, ‘ইংরেজি করুন: ‘‘আমি তোমাকে খাওয়াবো’’।’
ঐ প্রার্থী বেশি দেরি না করে উত্তর দিলো, ‘আই শ্যাল ইট ইউ’।’
‘ভাইভা বোর্ডের আরেকজন রসিকতা করে বললেন, ‘‘ইট’’ অর্থ হচ্ছে ‘‘খাওয়া’’, তাহলে আপনার কথার অর্থ দাঁড়ায় ‘‘আমি তোমাকে খাবো’’। কী বললেন এটা?’
ঐ প্রার্থী বললো, ‘আমার ভুল হয়েছে স্যার, স্যরি।’
‘আপনি আসতে পারেন। ... নেক্সট।’
আরেকজন ছেলেপ্রার্থী প্রবেশ করলো ভাইভা বোর্ডে।
তাকে কিছু প্রশ্ন করার পর ভাইভা বোর্ডের একজন তাকে একপর্যায়ে প্রশ্ন করলেন, ‘ইউ আর টেন ইয়ার্স ওল্ড’ এই বাক্যটির ‘‘টেন’’ এর নীচে যদি দাগ দেয়া হয়, তাহলে ডব্লিউ-এইচ কোশ্চেন কী হবে?’
ঐ প্রার্থী তেমন কিছু না ভেবে উত্তর দিলো, ‘এটা তো বেশ সহজ। এটার ডব্লিউ-এইচ কোশ্চেন হবে ‘‘হাও ওল্ড আর ইউ?’’
প্রশ্নকর্তা বললেন, ‘তাহলে ‘‘আই এম টেন ইয়ার্স ওল্ড’’ এর ডব্লিউ-এইচ কোশ্চেন কী হবে?’
ঐ প্রার্থী নিজের ভুল বুঝতে পেরে চুপ করে রইলো।
প্রশ্নকর্তা বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি আসতে পারেন। ... নেক্সট।’
এবার প্রবেশ করলো নীলা।
নীলাকে যা যা জিজ্ঞেস করা হলো, নীলা বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলো। শেষে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইংরেজি করুন: ‘‘আমি তোমাকে খাওয়াবো’’।’
নীলা একটু ভেবেই উত্তর দিলো, ‘আই শ্যাল ফীড ইউ’।’
প্রশ্নকর্তা খুশি হয়ে গেলেন।
এরপর আরেকজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইউ আর টেন ইয়ার্স ওল্ড’ এই বাক্যটির ‘‘টেন’’ এর নীচে যদি দাগ দেয়া হয়, তাহলে ডব্লিউ-এইচ কোশ্চেন কী হবে?’
নীলা বিনয়ের সাথে বললো, ‘স্যার, বাক্যটি আবার বলুন।’
প্রশ্নকর্তা বাক্যটি পুণরায় বলার পর নীলা উত্তর দিলো, ‘হাও ওল্ড অ্যাম আই’।’
নীলার এই প্রশ্নের উত্তরে ভাইভা বোর্ডেল সবাই বেশ খুশি হলেন।
এবার ভাইভা বোর্ডের প্রধান নীলাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলুন তো, শূন্যের কি কোনো দাম আছে?’
‘স্যার, শূন্যের দাম কখনো আছে, কখনো নেই।’
প্রশ্নকর্তা অবাক হবার ভান করে বললেন, ‘মানে?’
নীলা বললো, ‘স্যার, শূন্য যখন সংখ্যার আগে আসে বা একা আসে, তখন শূন্যের কোনো দাম থাকে না। কিন্তু যদি কোনো সংখ্যার মাঝখানে বা শেষে আসে তখন দাম আছে। আবার দশমিক ভগ্নাংশে শূন্য যখন দশমিকের পরে আসে, তখন শূন্যেরও কোনো দাম নেই, দশমিকেরও দাম নেই।...’
ভাইভা বোর্ডের প্রধান নীলাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে। আর বলতে হবে না। শুনুন, আপনার পারফর্মেন্স দারুণ। কিন্তু আপনাকে আমরা চাকরি দিতে পারছি না। কারণ আমাদের প্রতিষ্ঠানে দরকার স্মার্ট কর্মী।’
নীলা সামান্য ভেবে বললো, ‘কিন্তু বিজ্ঞপ্তিতে তো এরকম কোনো শর্ত উল্লেখ করা হয়নি!’
‘সব কিছু বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা যায় না।’
‘কালো মেয়ে কি স্মার্ট হতে পারে না? শুধু কালো বলেই কি মানুষ আনস্মার্ট?’
‘আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমরা বাধ্য নই।’
‘ঠিক আছে, আমাকে কালো দেখেও কেন তাহলে আমার ইন্টারভিউ নিতে গেলেন? প্রথমেই বলে দিতে পারতেন, আপনার চাকরি হবে না। চলে যান।’
‘ভেবেছি আপনাকে প্রশ্ন করেই আটকে দেবো। কিন্তু...’ পাশ থেকে একজন বললেন।
‘আপনি আসতে পারেন।... নেক্সট।’ বলে নীলাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলেন না ভাইভা বোর্ডের প্রধান।
নীলা বাড়ি এসে কান্নাকাটি করতে লাগলো। ওর মা বললেন, ‘কী হয়েছে নীলা? কোনো বিপদ?’
‘না, মা। শুধু কালো বলেই আজ আমার চাকরি হয়নি।’
‘দুঃখ করিস না। মানুষ সব সময় সব দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ হয় না। তোর ভাগ্যে হয়তো আরো বড় কিছু আছে।’
‘মা, আমার ভাগ্যের প্রতি আমার আর কোনো আস্থা নেই।’
এরই মধ্যে নীলার ফোন বেজে উঠলো। জেরিন কথা বলতে লাগলো, ‘নীলা, প্রাইমারী স্কুলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এপ্লাই করবি?’
‘না রে, আমার কোথাও চাকরি হবে না।’
‘কেন এমন বলছিস? আর হ্যাঁ, আজ-কালের মধ্যে তোর একটা ইন্টারভিউ হবার কথা ছিল, সেদিন ফোনে বললি। ওটার কী হলো?’
‘ইন্টারভিউ ভালোই হলো। কিন্তু ওরা শেষে বললো, আমাদের স্মার্ট কর্মী দরকার।’
‘বাদ দে এসব। কোম্পানীর চাকরি এমনই। পরিশ্রমও বেশি। প্রাইমারীর চাকরিতে এরকম কোনো সমস্যা নেই। আমি যে প্রাইমারী স্কুলে পড়েছি, সেখানেও একজন ম্যাডাম চাকরি করতেন, যিনি কালো ছিলেন। ভাগ্য ভালো হলে তোরও চাকরি হয়ে যেতে পারে। কোনো কথা নেই। আমি এপ্লাই করবো। তুইও করিস।’
২৪.
‘মা, এ পর্যন্ত কতো জায়গায় পরীক্ষা দিলাম, কোথাও চাকরি হলো না। প্রাইমারীতেও ভাইভা পর্যন্ত দিলাম। এখনো কোনো খরব নেই। কী করবো! আর কত জায়গায় ইন্টারভিউ দেবো! মাঝে মাঝে মনে চায়, গার্মেন্টসে গিয়ে কাজ করি।’ খুব মন খারাপ করে নীলা বললো ওর মা’কে।
‘এমন কথা বলছিস কেন? গার্মেন্টসে কারা চাকরি করে, তুই জানিস? তুই কি আমাদের বোঝা হয়ে গেছিস? তোকে কি আমরা অবহেলা করছি? ধৈর্য্য ধর। সুদিন আসবেই।’
নীলার মা কথাটি শেষ করতে না করতেই নীলার ফোন বেজে উঠলো। নীলা ইশারায় ওর মাকে একটু চুপ থাকতে বলে ফোন রিসিভ করলো। অন্য প্রান্ত থেকে জেরিন জিজ্ঞেস করলো, ‘নীলা, আজ প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে। আমার হাজবেন্ড নেটে দেখেছে, আমার রোল নং নেই। তোর ফলাফল কী?’
‘ফলাফল প্রকাশের কথাই আমি জানি না। তোর কাছেই এখন শুনলাম।’
‘তোর রোল নং টা দে। ফোনে আমার হাজবেন্ডকে দেবো। তোর ফলাফল দেখে সে আমাকে জানালে আমি তোকে ফোন করে জানাবো।’
‘আমি মুখস্থই পারি। তোকে বলছি। লিখে নে।’
নীলা জেরিনকে ওর রোল নং বলে দিলো। কিছুক্ষণ পর আবার নীলার ফোন বেজে উঠলো। জেরিন বললো, ‘নীলা, তোর চাকরি হয়ে গেছে। তুই খুব ভাগ্যবান। আমার ভাইভাটাও মোটামুটি ভালোই হলো। কিন্তু আমার চাকরি হলো না।’
নীলা ফোন রেখে দিয়ে ওর মাকে বললো, ‘মা, প্রাইমারি স্কুলে আমার চাকরি হয়েছে।’
‘সত্যি?’
‘জেরিন ওর হাজবেন্ডের মাধ্যমে জেনে নিয়ে এইমাত্র আমাকে ফোনে বলেছে। মা, আমার কিছুতেই বিশ^াস হচ্ছে না।’
‘আগে তোর বাবাকে জানিয়ে দে। এরপর তোর মামা সহ আমাদের সব আত্মীয়কে জানিয়ে দিস।’
‘ঠিক আছে।’ বলে নীলা ওর ফোন হাতে নিলো।
২৫.
রাতে ওর বাবা বাড়ি আসার পর খেতে বসে নীলাকে বললেন, ‘তুই তোর মামাকে ফোনে তোর চাকরির কথা জানানোর পর তোর মামা আমাকে ফোন করে বললেন, ‘এবার নীলার জন্য ভালো ভালো জায়গা থেকে প্রস্তাব আসবে।’
‘এতোদিন যখন বিয়ে করিনি, এখন তো আর কোনোভাবেই করবো না।’
‘কী সব উল্টাপাল্টা কথা বলছিস! যেসব মেয়ের বিয়ে হয় না, তাদের কোথাও চাকরি হলে, তাদের বিয়ে হতে তেমন দেরি হয় না। তুই এটা বুঝিস না?’
‘বুঝি বলেই আমি এখন কোনোভাবেই বিয়ে করবো না। আগে মানুষ দেখতো আমরা ওদেরকে কত টাকা যৌতুক দিতে পারবো। আর এখন আমার চেয়ে আমার চাকরিকে মানুষ গুরুত্ব দেবে বেশি। আমার দাম তাহলে কোথায়! আমাকে তো কেউ দাম দিচ্ছে না।’
‘তোকে আর বুঝাবো না। এবার তোর মর্জির উপর ছেড়ে দিলাম।’
২৬.
একদিন বিকেলে নীলা স্কুল থেকে ফেরার পথে বাড়ির কাছাকাছি আসতেই ওর ফোন বেজে উঠলো। ও প্রান্ত থেকে জেরিন বললো, ‘কিরে নীলা, তুই এখন কোথায়? তোর সাথে একটু কথা আছে। এখন বলা যাবে?’
‘স্কুল থেকে ফিরছি। বাড়ির কাছাকাছি। ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে তোকে ফোন করবো।’
‘এবার বল, কী জন্যে ওই সময় ফোন করেছিস? তোর কি কোনো নতুন খবর আছে?’
‘‘নতুন খবর’ মানে?’
‘মানে আর কী! বিয়ের পর ঘরে নতুন মেহমান আসে না? সেই খবর।’ একটু হেসে নীলা বললো।
‘না, নতুন খবর আমার নয়, নতুন খবর তোর।’
‘বিয়ে না হতেই আমার কিসের নতুন খবর! কী সব উল্টাপাল্টা বলছিস! পাগল হয়ে গেলি নাকি!’
‘সত্যিই নতুন খবর। তবে যে রকম ভাবছিস, সেরকম নয়। লম্বা কথা। তোর হাতে সময় আছে?’
‘আছে। বল।’
‘ইন্টার পাশ করার পর নাবিল এবং সাগর উভয়ে ঢাকায় চলে যায়, তুই জানিস। এটাও জানিস, ওদের সাথে আমার প্রায়ই ফোনে কথা হয়। তোকে কখনো ওদের সম্পর্কে কিছু বলতাম না। কারণ তোর ভালো লাগতো না। আগে বলি নাবিলের কথা। নাবিল আমাকে প্রায়ই বলতো, সে তোকে বিয়ে করার চেষ্টা করবে, যদি সে প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত তোর বিয়ে না হয়। কিন্তু অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময় ওর ভাইয়া হঠাৎ একদিন হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। ওর ভাইয়া ঢাকায় ব্যবসা করতো। একটা ছেলে ছিল তিন বছর বয়সী। ওর ভাইয়ার মৃত্যুর পর ওর ভাবিকে তার বাবার বাড়ির সবাই তার বাবার বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলো। তাদের ইচ্ছা ছিল তাদের মেয়ের বয়স এখনো কম। ওকে অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দেবে। কিন্তু নাবিলের ভাবি তার বাবার বাড়ি যেতে চাইলো না। সে বললো, আমি এমন ভালো স্বামী আর পাবো না। আমি আমার এই ছেলেকে নিয়েই জীবন কাটাবো। নাবিলের বাবা-মা না পারছিলো ওর ভাবিকে থাকতে বলতে, না পারছিলো যেতে দিতে। কারণ যেতে দিলে তিন বছরের এই ছেলেকে কিভাবে লালন পালন করবে! আর নাতিকে ওর মায়ের সাথে যেতে দিতেও ওরা চাইছিলো না। এই সঙ্কট যখন মারাত্মক হয়ে গেলো, তখন হঠাৎ একদিন নাবিলের এক বোন আছে, সে প্রস্তাব দিলো, যদি নাবিল ওর ভাবিকে বিয়ে করে, তাহলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। নাবিলের ভাইয়ার ব্যবসাটাও সে চালাতে পারবে। শেষে নাবিলকে এই প্রস্তাব দেয়ার পর এবং অনেক বুঝানোর পর নাবিল অনেক চিন্তা-ভাবনা শেষে রাজি হয়। কারণ ওর ভাবি তার বাবার বাড়ি যেতে চাইছিল না। নাবিল ভাবলো, ‘এভাবে অল্পবয়সী একজন মহিলা কিভাবে স্বামী ছাড়া একটা জীবন কাটাবে! তাই নাবিল মানবিক দিক লক্ষ্য করে ওর ভাবিকে বিয়ে করলো। এখন সে তার ভাইয়ার ব্যবসা চালাচ্ছে আর ব্যবসার ফাঁকে পড়াশুনাও চালিয়ে যাচ্ছে।’ লম্বা কথা বলার পর একটু থামলো জেরিন।
নীলা বললো, ‘তোর সাথে আমার মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়। আমাকে আগে কখনো বলিসনি কেন?’
‘বলে কী লাভ হতো! নাবিল তো তোকে বিয়ে করার সুযোগই শেষ হয়ে গেলো। তোরও হয়তো খারাপ লাগতো। কারণ নাবিল তোকে পছন্দ করতো, তুইও এটা জানতি।’
‘তাহলে এখন কেন বলতে গেলি?’
‘এটা ছিল ভূমিকা। কথাগুলো এখন বলতে যাওয়ার মূল কারণ হলো সাগর।’
সাগরের নাম বলতেই নীলার মনে ভেসে উঠলো তাকে দেয়া সাগরের প্যাকেটটির কথা। সাথে ছোট্ট চিরকুটের কথা। তাতে লেখা ছিলো, ‘সরি, সরি এবং সরি। সম্ভব হলে আমাকে মাফ করবেন। আমি যে অন্যায় করেছি, সেজন্য শুধু মাফ চাওয়াকেই আমি যথেষ্ট মনে করছি না। পারলে আপনাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিতাম। আপনি রাজি হোন, কি না হোন, সেটা পরের কথা। কিন্তু তা সম্ভব নয়। কারণ আমার এখনো কোনো ইনকাম সোর্স নেই। তবু আপনার বিয়ের আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করবো।
আরেকটি কথা। এই পারফিউমটি আপনার জন্য উপহার। এটি আমার বড় ভাইয়া আমার জন্য পাঠিয়েছেন আমেরিকা থেকে। সাগর।’
জেরিন বললো, ‘কথা কলছিস না যে! শুনতে পাচ্ছিস?’
‘হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি। বল।’
‘সাগরের ঘটনা আরো আগের। তোকে আমি আগেও একদিন বলেছি, সাগরও নাবিলের মতো তোকে ভালোবাসে। ঢাকা চলে যাবার পর সাগর যখন অনার্স থার্ড ইয়ারে উঠেছে মাত্র, তখন ওরা সপরিবারে আমেরিকা চলে যায়। ওর বড় ভাইয়া আমেরিকা থাকতো।’
জেরিন এ পর্যন্ত বলার পর নীলার মনে পড়ে যায় ওকে দেয়া সাগরের গিফটের কথা। সাগর চিঠিতে লিখেছিল, ‘এই পারফিউমটি আপনার জন্য উপহার। এটি আমার বড় ভাইয়া আমার জন্য পাঠিয়েছেন আমেরিকা থেকে।’
‘আমার কথা শুনছিস?’ জেরিন বললো।
‘হ্যাঁ, শুনছি। বল।’
‘সাগর প্রায়ই আমার সাথে ম্যাসেঞ্জারে কথা বলতো। ও বেশির ভাগ সময় তোর সম্পর্কে জানার জন্যই ফোন করতো। গতকাল সে ফোন করে জানিয়েছে, ওর নাকি গ্রীন কার্ড হয়ে গেছে। ওখানে তার একটা চাকরিও হয়েছে পার্টটাইম। সাথে পড়াশুনা তো চলছেই। সামনের মাসে সে দেশে আসবে। এসেই বিয়ে করবে।’
এ পর্যন্ত বলে জেরিন একটু থামলো।
‘থেমে গেলি কেন?’
‘না, দেখছি, তোর কৌতুহল কেমন?’
‘আমার কৌতুহল দিয়ে কী হবে? ওর জন্য পাত্রী ঠিক হয়েছে?’
‘সাগর আমাকে গতকাল ফোন করেছে শুধু তোর বিয়ে হয়েছে কিনা, তা জানার জন্য।’
‘কেন?’
‘আমি যখন বলেছি, ওর এখনও বিয়ে হয়নি, তবে প্রাইমারী স্কুলে ওর চাকরি হবার পর থেকে প্রায় প্রতিদিন ওকে কোনো না কোনো জায়গা থেকে দেখতে আসছে। কিন্তু ও রাজি হচ্ছে না। এ কথা শুনে সাগর অস্থির হয়ে গেলো। সে বললো, আমি প্রস্তাব দিলেও কি রাজি হবে না? আমি বললাম, সেটা নীলাকে জিজ্ঞেস করা ছাড়া কিভাবে বলি! এরপর সাগর আমাকে অনুরোধ করে বললো, তোকে তার পক্ষ হয়ে একবার এই কথাটা জিজ্ঞেস করতে।’
‘জেরিন, আমি কোথাও কেন রাজি হচ্ছি না, তুই জানিস। কিন্তু সাগরের প্রস্তাবে আমার দ্বিমত নেই। তুই ওকে বলে দিতে পারিস।’
‘আচ্ছা তাহলে রাখ, ওকে এখনই কল দিচ্ছি।’
কিছুক্ষণ পর জেরিন ফোন করে নীলাকে বললো, ‘তুই রাজি হবার কথা জেনে খুশিতে সাগরের কথাই বন্ধ হয়ে গেছে কিছুক্ষণের জন্য। শেষে আমাকে বললো, ‘তোকে নিয়ে নাকি ওর একটা বিশেষ পরিকল্পনা আছে। ও সামনের মাসের ৮ তারিখে দেশে আসছে। এসেই তোকে নিয়ে এক জায়গায় যাবে।’
২৭.
নীলাদের বাসায় ওর বাবা-মা, জেরিন, নীলার মামা সবাই বসে আছেন। শুধু নীলা নেই। নীলার বাবা বললেন, ‘জানি না, কিভাবে সাগরের সাথে বিয়ের জন্য নীলা রাজি হয়েছে। এতোদিন এতো দিক থেকে প্রস্তাব এলো, কোথাও রাজি হয়নি।’
‘ভাগ্য ভালো। শেষে রাজি হয়েছে। এখন আর এগুলো নিয়ে ভেবে লাভ নেই।’ একটু থেমে নীলার মামা আবার বললেন, ‘আচ্ছা, ওরা গেলো কোথায়? সকালে গেছে। বিকেল হয়ে গেলো। এখনো আসছে না কেন? কোথায় গেছে, আপনাদেরকে কিছুই বলেনি?’
এসময় দরজায় শব্দ হলো।
দরজা খুলে দিলেন নীলার মা। বাইরে তাকিয়ে অবাক হয়ে যান।
নীলার বাবা বললেন, ‘কী হয়েছে? দাঁড়িয়ে আছো কেন? কে এসেছে? নীলা? ভেতরে আসছে না কেন?’
‘দেখো, দেখো, সাগরের সাথে এ কোন মেয়ে? আমাদের নীলা এখন আর নীলা নেই!’
নীলা এবং সাগর ভেতরে আসার পর সবাই নীলাকে দেখে অবাক হয়ে গেলো। নীলার গায়ের রং পাল্টে গেছে।
ভেতরে আসার পর সাগর বললো, ‘যুগ যুগ ধরে সারা বিশে^ই মানুষ ত্বক ফর্সা করার অনেক ক্রীম ব্যবহার করে আসছে। আগের চেয়ে ফর্সা হোক বা না হোক, ত্বকের তো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। এখন পার্লারের যুগ। অনেক কালো মেয়েকে দেখে হঠাৎ চেনাই যায় না। পরে মনে হয়, মেয়েটি নিশ্চয়ই পার্লার থেকে ঘুরে এসেছে। ক্ষতি তো হচ্ছে না। কিছু পয়সা হয়তো খরচ হচ্ছে। আমি নীলাকে পার্লারে নিয়েছি ওকে আমার কাছে দেখতে সুন্দর লাগবে, এজন্যে নয়। কারণ আমি একটি প্রবাদ পড়েছি এরকম, ‘বাতি নিভিয়ে দিলে কালো-সাদা সবই সমান।’
একটু থেমে সাগর আবার বলতে শুরু করলো, ‘এক সময় কালো মেয়েদের প্রতি আমার একটা অনীহা ছিল। কিন্তু কলেজে থাকতে আমার এক বন্ধু ছিল নাবিল। ওর সাথে থেকে আমার এই অনীহা অনেকটা কেটে গেলো। শেষে আমেরিকা যাবার পর বাকিটাও কেটে গেলো। দেখেছি, সেখানে কালো-সাদার তফাৎ এখন আর তেমন কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় না। বরং অনেক ফর্সা মেয়ে রোদে পুড়ে কালো হয়ে যেতে চায়। নীলাকে পার্লারে নিয়েছি শুধু এই উদ্দেশ্যে, কালো হওয়াতে ওর মনে সবসময় একটা হীনমন্যতা কাজ করতো, তা দূর করার জন্য। আমি কি অন্যায় কিছু করেছি?’
কেউ কিছু বললো না। সবাইকে এতে সন্তুষ্ট বুঝা গেলো।
শেষে নীলার বাবা বললেন, ‘আমি প্রায়ই নীলকে বলতাম, নীলা, মন খারাপ করিস না। সব মানুষ জীবনে সব কিছু পায় না। একটা বিষয় হয়তো তোর মনমতো পাসনি। তাই বলে অন্য সব বিষয়ও যে তোর বিপক্ষে যাবে, তা না ভেবে অপেক্ষা কর। দেখবি, সময় কথা বলবে।’
‘তাহলে আমার বাবা-মাকে নীলার সাথে বিয়ের কথা জানাতে পারি? জানলেই ওরা দেরি না করে দেশে চলে আসবে। আমি আসার সময় সামান্য ইঙ্গিত দিয়েই বুঝেছি।’
‘নীলাকেই ওর বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করো। সে এতোদিন কোনোভাবে বিয়ের জন্য রাজি হচ্ছিল না।’ নীলার মামা বললেন।
নীলার মামার কথা শুনে নীলা সামান্য মুচকি হেসে নিজের রুমের দিকে চলে গেলো। এমন হাসি হয়তো নীলা ওর জীবনে খুব কমই হাসার সুযোগ পেয়েছে। নীলার হাসি দেখে সাগরের মুখেও হাসির রেখা দেখা দিলো।
...................................................................................
[ সতর্কীকরণ:
লেখকের অনুমতি ছাড়া গল্পটি কোনো নাটকে বা অন্য কোথাও ব্যবহার করা যাবে না। লেখকের ফেসবুক: https://www.facebook.com/nurahmad.teacher]
কালো মেয়ে (রোমান্টিক গল্প)
Reviewed by Nur Ahmad
on
December 20, 2019
Rating:

No comments: